নির্মলার গতানুগতিক বাজেটে বঙ্গে বিসর্জনের বাজনা! এটুকুই রাজনৈতিক বার্তা
প্রতিদিন | ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বিধানসভা ভোটের তিন মাস আগেই নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহরা বাংলায় তাঁদের পরাজয় নিয়ে নিশ্চিত। বঙ্গবাসীর কাছে এককথায় এটাই হল কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণের পেশ করা ২০২৬-’২৭ সালের বাজেট প্রস্তাবের নির্যাস। বস্তুত, অতীতে কোনও কেন্দ্রীয় বাজেটই রাজ্যবাসীর কাছে এত বড় রাজনৈতিক বার্তা নিয়ে আসেনি। আসলে, অর্থনীতির নিরিখে এবারে নির্মলার বাজেট এতটাই ঘোষণাহীন ও গতানুগতিক ছিল যে এই রাজনৈতিক বার্তাটুকু ছাড়া ৮৫ মিনিটের ভাষণ থেকে ছেনে বের করার মতো কিছু নেই।
বিভিন্ন জনমত সমীক্ষায় এ রাজ্যে তৃণমূলের তুলনায় বিজেপি অনেকটাই পিছিয়ে। বিজেপির অভ্যন্তরীণ সমীক্ষাতেও যে সেই একই ছবি ধরা পড়ছে– তা স্পষ্ট বোঝা গিয়েছে নির্মলার বাজেট ভাষণ শুনতে শুনতে। না হলে বাংলাকে এতটা উপেক্ষা তিনি হয়তো করতে পারতেন না। গত এক যুগ ধরে দেখা গিয়েছে মোদি-শাহরা অপটিক্সের রাজনীতি করতে ভীষণ দড়। যদি বাংলায় জেতার এক বিন্দু সম্ভাবনা থাকত তাহলে তাঁরা ভোটের মাত্র তিন মাস আগে বাজেটকে ব্যবহার করার সুযোগ হাতছাড়া করতেন না।
নির্মলা অবশ্য সাফাই দিয়েছেন যে তিনি ভোটের কথা মাথায় রেখে বাজেট করেন না। এটা শুনে সেই প্রবাদটি আওড়াতে হয়, ‘বিড়াল বলে মাছ খাব না কাশী যাব’। কারণ, বর্তমান বিজেপি দলটা ভোটের কথা মাথায় না রেখে কোনও কাজই করে না। একটা ভোট শেষ হলে, পরের দিনই তারা পরবর্তী ভোটের প্রস্তুতিতে নেমে পড়ে। ৩৬৫ দিনই তারা ‘ভোট মোড’-এ থাকে। ফলে বাজেটের সময় যে তারা ‘ভোট মোড’ থেকে বেরিয়ে গিয়েছে এমনটা মনে করার
কোনও কারণ নেই। বিহারের মতো বাংলার জন্য বাজেটে নির্মলার কল্পতরু না হওয়ার নেপথ্যেও সুচিন্তিত ভোটচিন্তাই রয়েছে। বাংলায় জয় পাওয়া যাবে না নিশ্চিত হয়েই বড়সড় প্রকল্প বা বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।
মোদি-শাহর বার্তা ধরতে পেরে তলানিতে রাজ্য বিজেপির নেতা-কর্মীদের মনোবল। সংবাদমাধ্যমেই দেখা যাচ্ছে বিজেপির রাজ্যনেতারা তাঁদের হতাশা গোপন রাখতে পারছেন না। কর্মীদের মনোবল কিছুটা চাঙ্গা করতে ২৪ ঘণ্টা পর মাঠে নামানো হয়েছে রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণবকে। তিনি ঘোষণা করেছেন, শিলিগুড়িতে বুলেট ট্রেন-সহ বাংলাকে আরও ১২টি নতুন ট্রেন দেওয়া হবে। এতে কি চিঁড়ে ভিজবে? মুম্বই থেকে আমেদাবাদ পর্যন্ত বুলেট ট্রেন এত বছরেও চালু করা গেল না। কবে চালু করা যাবে তাও বোঝা যাচ্ছে না। যাই হোক, তবু বিজেপি নেতারা হয়তো ভোটের প্রচারে বলার মতো কিছু পাবেন।
কিন্তু নির্মলার বাজেটে বাংলার জন্য শাঁসালো কিছু না-রাখার মধ্য দিয়ে মোদি-শাহদের যে মনোভাব প্রকাশ হয়ে গিয়েছে, তাকে কীভাবে আড়াল করা সম্ভব? প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদারের মন্তব্য মোদি-শাহর বার্তাকে আরও জল-হাওয়া দিয়ে দিয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, বাংলাকে প্রকল্প দিলেও তৃণমূল সরকার তা রূপায়ণে জমি দেবে না। অর্থাৎ, সুকান্তও মেনে নিয়েছেন যে, এপ্রিলের পরেও রাজ্যে তৃণমূল সরকারই থাকবে।
সুতরাং নির্মলার বাজেট ভোটের আগে চায়ের দোকানের আড্ডায় জমজমাট রাজনৈতিক বিতর্কের টপিক জুগিয়ে দিয়েছে। ভোটযুদ্ধের আগে স্বস্তি এনে দিয়েছে তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকদের মনে। এখনও বামেদের কিছু দোদুল্যমান ভোটার রয়েছে। তাদের সংশয়ের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে বাজেটের বার্তা। এতে আখেরে বিজেপির ভোট আরও কমে যেতে পারে বলে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন।
ভোটমুখী বিহারের জন্য গত বছরে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার উপর প্রকল্প দিয়ে নির্মলা প্রত্যাশা বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। বিহারে নীতীশ কুমারের মতো শরিকের চাপ একটা ফ্যাক্টর ছিল। বাংলার ক্ষেত্রে এতটা কেউ প্রত্যাশা করছিল না। কিন্তু এভাবে প্রত্যাখানের বার্তাও কারও কাছেই দুর্বোধ্য ঠেকেনি। পর্যটনের ক্ষেত্রে বুদ্ধ সার্কিটে সিকিম-সহ উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলির অন্তর্ভুক্তির কথা ঘোষণা করলেন নির্মলা, কিন্তু তাতেও রহস্যজনকভাবে বাদ পড়ল বাংলা। অথচ কালিম্পং পুরো বিশ্বের বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের কাছে স্বীকৃত, দলাই লামাকে সেখানকার বৌদ্ধমঠে প্রায়শই আসতে দেখা যায়।
বাংলা থেকে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক এভারেস্টজয়ী। অথচ প্রস্তাবিত ট্রেকিং রুটে বাংলার নাম উচ্চারণ করলেন না নির্মলা। ডানকুনি, শিলিগুড়ি ও দুর্গাপুরের নাম একবার করে এলেও নির্মলার ভাষণ শুনে বোঝা গেল না ভারতের মানচিত্রে ‘পশ্চিমবঙ্গ’ নামেও কোনও জায়গা রয়েছে! কিছু প্রকল্পের ক্ষেত্রে উল্লেখ করা হল এগুলি পূর্ব ভারতে হবে। এক্ষেত্রে বাংলার নাম নিতে বাধা কী ছিল?
সচেতনভাবেই যে বাংলাকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে, তা বলা বাহুল্য। ভোটমুখী অসম ‘নিমহ্যান্স’ পেয়েছে। এ ছাড়াও উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্য হিসাবে তাদের জন্য রয়েছে কিছু প্যাকেজ। কেরল, তামিলনাড়ুতে বিজেপি এখন তৃতীয় শক্তি। পুদুচেরিতে বিজেপি ক্ষমতায় না থাকলেও তা কেন্দ্রশাসিত। তবুও বস্ত্রশিল্প, ডাব ও নারকেলের বাজার প্রসারে বিশেষ উদে্যাগ, অায়ুর্বেদ গবেষণার কেন্দ্র ইত্যাদির মাধ্যমে ভোটমুখী এই রাজ্যগুলি ভাষণে বাংলার মতো উপেক্ষিত ছিল না। ‘মহিলা’ অর্থমন্ত্রীর পোশাক নিয়ে মন্তব্য বলে ভাববেন না এটিকে– তবে কাঞ্জিভরম শাড়ি পরে নির্মলা সীতারমন যেন-বা দক্ষিণের রাজ্যগুলির সঙ্গে একাত্ম হওয়ার চেষ্টা করলেন!
ফলে, বাজেট রাজনীতি বা ভোট কোনওটাই পুরোপুরি এড়িয়ে যায়নি। বাজেটের মূল দর্শনেও মোাদির রাজনীতির প্রতিফলন রয়েছে। ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর নরেন্দ্রে মোদির স্লোগান ছিল, ‘স্বল্প সরকার, সর্বোচ্চ সুশাসন’। সবকিছু বাজারের হাতে ছেড়ে নির্মলা সেই দর্শনেই অটল থেকেছেন। কর্মসংস্থান নিয়ে এত হইচইয়ের পরেও তা বাড়াতে সরকারের কোনও উদ্যোগ বাজেটে দেখা যাচ্ছে না। কোভিডের পরে কয়েকটি বাজেটে কেন্দ্রের চাহিদা বাড়ানোর তাড়না ছিল। সে-কারণে আয়করে ছাড় দেওয়া হয়েছে পরপর দু’টি বাজেটে। এবার নজর জোগান শৃঙ্খলায়। দেশে পণ্য উৎপাদন বাড়াতে তাই আমদানি শুল্কে কিছু ছাড়ের ব্যবস্থা দেওয়া হয়েছে। সরকারের ঋণ ও রাজকোষ ঘাটতি নিয়ন্ত্রণের জেরে কোপ পড়েছে কৃষি ও গ্রামোন্নয়নের বাজেটে।
রাস্তা, রেল ইত্যাদি খাতে মূলধনী ব্যয় এবারও বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু কেন কাঙ্ক্ষিত বেসরকারি বিনিয়োগ আসছে না, সেই প্রশ্নের উত্তর নেই বাজেটে। সর্বোচ্চ গতিতে আর্থিক বৃদ্ধির পরেও কেন মাথাপিছু আয়ে ভারত বিশ্বে ১৫৮তম স্থানে, নেই সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টাও। অনুপস্থিত আর্থিক বৈষম্য কমাতে কোনওরকম হস্তক্ষেপের ভাবনা। আর্থিক বৃদ্ধিই যেন সব অসুখের দাওয়াই! এটাও অবশ্য ভোট টানার এক মোক্ষম অপটিক্স-ই।