• হস্টেল ফি বকেয়া, অ্যাডমিট না পেয়ে বছর নষ্ট পরীক্ষার্থীর
    এই সময় | ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • বুদ্ধদেব বেরা, ঝাড়গ্রাম

    টেস্ট পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেয়ে পাশ করেছিল। কিন্তু তিন বছরের হস্টেল ফি বকেয়া থাকায় পরীক্ষার্থীর অ্যাডমিট কার্ড আটকে রাখে স্কুলহস্টেল কর্তৃপক্ষ। ফলে সোমবার মাধ্যমিকের প্রথম দিন জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষাই দিতে পারল না ঢোলকাট পুকুরিয়া প্রণবানন্দ বিদ্যামন্দিরের ছাত্র দিবাকর মুর্মু। যদিও বিষয়টি পরে জানাজানি হওয়ায় অ্যাডমিট কার্ড হাতে পায় সে। তাই নিয়ে মঙ্গলবার ইংরাজি পরীক্ষা দেয় দিবাকর। যদিও পর্ষদের তরফে জানানো হয়েছে, প্রথম পরীক্ষায় অনুপস্থিত থাকার কারণে ওই ছাত্রের একটা বছর নষ্ট হলো।

    বিনপুর-১ ব্লকের ফুলঝোর গ্রামে দিবাকরের বাড়ি। পরিবারে মা-বাবা ও বোন রয়েছে। বাবা হরেকৃষ্ণ মুর্মু একজন ক্ষুদ্র চাষি। মা গৃহবধূ। বোন পানমণি আউলিয়াতে মামার বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করে। দিবাকরের বাবা বলেন, 'দুই সন্তানের পড়াশোনার ভার আমার পক্ষে চালানো অসম্ভব। তাই ছেলেকে আশ্রমের হস্টেলে ভর্তি করেছিলাম। কিন্তু টাকা দিতে পারিনি বলে আমার ছেলে তার জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা দিতে পারবে না, এটা আমার কল্পনার বাইরে ছিল।'

    জানা গিয়েছে, ঢোলকাট পুকুরিয়া প্রণবানন্দ বিদ্যামন্দির একটি আশ্রম কর্তৃক পরিচালিত স্কুল। আশ্রম চত্বরে ছাত্রদের জন্য স্কুলের একটি হস্টেল হয়েছে। যেখানে প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ুয়ারদের থাকার বন্দোবস্ত রয়েছে। ছেলে যাতে ভালো ভাবে পড়াশোনা করতে পারে সে জন্য ষষ্ঠ শ্রেণিতে দিবাকরকে ওই স্কুলের হস্টেলে রাখার ব্যবস্থা করেন হরেকৃষ্ণ। দিবাকর তপসিলি উপজাতিভুক্ত (এসটি) হওয়ায় অনগ্রসর শ্রেণি কল্যাণ দপ্তর থেকে তার হস্টেলের খরচ দেওয়া হতো। সেই টাকা হস্টেল কর্তৃপক্ষকে ফি হিসাবে দিত দিবাকর।

    অভিযোগ, তিন বছর দিবাকরের হস্টেল খরচ বাবদ ফি জমা না পড়ায় বকেয়া দাঁড়ায় প্রায় ৪৫ হাজার টাকা। গত ২২ জানুয়ারি রেজিস্টারের সই করিয়ে পরীক্ষার্থীদের হাতে অ্যাডমিট কার্ড তুলে দেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক গোপাল আচার্য। স্কুল সুত্রে জানা গিয়েছে, এ বছর ১২২ জন পরীক্ষার্থী মাধ্যমিক পরীক্ষা দিচ্ছে। তাদের মধ্যে দিবাকর-সহ পাঁচজন ছাত্রের হস্টেল ফি বকেয়া থাকায় অ্যাডমিটগুলি হস্টেল কর্তৃপক্ষ জমা রেখে তাদের বকেয়া বিল মিটিয়ে দিতে বলে। দু'জন পরীক্ষার্থী হস্টেলের সম্পূর্ণ বিল এবং দু'জন অর্ধেক বিল মিটিয়ে দিয়ে অ্যাডমিট কার্ড সংগ্রহ করে। কিন্তু অভিযোগ, দিবাকর অ্যাডমিট কার্ড নিতে আসেনি। হরেকৃষ্ণ দাবি করেন, 'এত টাকা জোগাড় করতে না পেরে স্কুল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ছেলের পরীক্ষার অ্যাডমিট কার্ডের জন্য অনেক বার যোগাযোগ করেছি। ওরা রবিবার দেওয়া হবে বলে আশা দিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অ্যাডমিট কার্ড দেওয়া হয়নি।'

    দিবাকরের পরীক্ষাকেন্দ্র ঝাড়গ্রাম ননীবালা বিদ্যালয় স্কুলে তার অনুপস্থিতির কারণ সন্ধান করতে গিয়ে বিষয়টি সামনে আসে। পরীক্ষাকেন্দ্রের প্রধান শিক্ষক মুক্তিপদ বিশুই পরীক্ষার প্রথম দিন দিবাকরের অনুপস্থিতির কারণ সন্ধান করতে গিয়ে জেনেছিলেন তার অ্যাডমিট কার্ড না থাকায় পরীক্ষা দিতে পারেনি। বিষয়টি উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে জানালে দ্রুত পদক্ষেপ করা হয়। মুক্তিপদ বলেন, 'বাংলা পরীক্ষার দিন ওই পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত থাকলেও এদিন সে ইংরাজি পরীক্ষা দিয়েছে।' দিবাকর বলে, 'মাধ্যমিকের টেস্ট পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করেছিলাম। হস্টেলের ফি দিতে না পারায় অ্যাডমিট পাইনি। আমার সমস্ত বন্ধুরা যখন বাংলা পরীক্ষা দিতে এলো আমি তখন ঘরেই বসেছিলাম। বাবার যদি টাকা থাকতো তাহলে আমিও বাংলা পরীক্ষাটা দিতে পারতাম।'

    আশ্রমের প্রধান ব্রহ্মচারী রবীন্দ্রনাথ মহারাজ বলেন, 'হস্টেলের বকেয়া ফি জমা দিয়ে পরীক্ষার আডমিট কার্ড নিয়ে যাওয়ার জন্য জানানো হয়েছিল। কিন্তু দিবাকর ছাড়া সকলেই টাকা জমা দিয়ে, কেউ মুচলেকা দিয়ে অ্যাডমিট কার্ড নিয়ে গিয়েছে। বলা হয়েছিল পরীক্ষার আগের দিন সকলকে হস্টেলে আসার জন্য। কারণ তাদের পরীক্ষা কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা আমাদের পক্ষ থেকেই করা হবে। কিন্তু বাকি চারজন এলেও দিবাকর আসেনি। তবে মঙ্গলবার সকালে পরিবারের সঙ্গে এসে অ্যাডমিট কার্ড নিয়ে গিয়েছে দিবাকর।' তিনি আরও জানান, ওই ছাত্র যদি সোমবার সকালে এসে যোগাযোগ করত, তাহলে ও প্রথম দিনের পরীক্ষা দিতে পারত।

    এদিন অ্যাডমিট কার্ড নেওয়ার জন্য দিবাকরের পরিবার ১০ হাজার টাকা জমা দিয়ে মুচলেকা দেয় আশ্রম কর্তৃপক্ষের কাছে। তবে এমন ঘটনায় মাধ্যমিক পরীক্ষার জেলা কনভেনার জয়দীপ হোতা বলেন, 'কোনও পরীক্ষার্থীর অ্যাডমিট কার্ড কারও আটকে রাখার অধিকার নেই। এটা আইনবিরুদ্ধ। ওই পরীক্ষার্থী একটি বিষয়ে পরীক্ষা না দেওয়ায় তার পুরো বছরটাই নষ্ট হয়ে গেল। এই ধরনের ঘটনা কখনও কাম্য নয়।' জেলা বিদ্যালয় পরিদর্শক (মাধ্যমিক) জগবন্ধু বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, 'বিষয়টি নজরে আসার পরেই স্কুল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং আশ্রমের হস্টেলে গিয়ে পরীক্ষার্থীর অ্যাডমিট কার্ড তার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। আগামী পরীক্ষাগুলি তার ভালো হোক এই কামনা করি। ছাত্রটির ভবিষ্যৎ নিয়ে যারা খেলা করেছে তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের ভাবনাচিন্তা রয়েছে।'

  • Link to this news (এই সময়)