• তৃণমূল ও বিজেপির নেতারা ঋণখেলাপি , ‘মৃত্যুমুখে’ নন্দীগ্রামের রানিচক সমবায় সমিতি
    বর্তমান | ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • শ্রীকান্ত পড়্যা, নন্দীগ্রাম: নন্দীগ্রাম-২ ব্লকের রানিচক সমবায় সমিতির অর্থসম্পদ যেন হরির লুটের প্রসাদ। এলাকার দাপুটে তৃণমূল ও বিজেপি নেতারা ওই সমবায় থেকে মোটা টাকা ঋণ নিয়ে ডিফল্টার হয়ে গিয়েছেন। তাঁদের দেখাদেখি সমবায়ের আরও ১৭৫ জন ঋণ নেওয়ার পর সমিতির ধারেকাছে ঘেঁষছেন না। স্বাভাবিকভাবেই প্রবল আর্থিক সংকটে ভুগছে সমবায়টি। ‘মৃত্যুমুখ’ থেকে বাঁচিয়ে আনার পথ খুঁজে পাচ্ছেন না ম্যানেজার।জানা গিয়েছে, শুধুমাত্র ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে সমবায়ের পাওনা ৫৭ লক্ষ টাকা। আর, ওই সমবায় সমিতির কাছ থেকে তমলুক-ঘাটাল সেন্ট্রাল কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্কের পাওনা ৯৭ লক্ষ টাকা। সমবায়ের প্রাক্তন ম্যানেজার নিরাপদ জানা নিজেও মোটা টাকার লোন নিয়ে ধরাছোঁয়ার বাইরে। ২০১৮ সাল থেকে সমবায়ে বোর্ড নেই। সেই সুযোগে জলের মতো ঋণ বিলি করা হয়েছে। সমিতির বর্তমান ম্যানেজার মনোহর মাঝি হতাশার সুরে বলেন, ‘প্রায় ১৮০ জন ঋণখেলাপি! তালিকায় রাজনৈতিক নেতারাও রয়েছেন। আমাদের কাছ থেকে ব্যাঙ্কের পাওনা ৯৭ লক্ষ টাকা। এই টাকার পরিমাণ প্রতি বছর বে঩ড়েই চলছে। ডিফল্টার সদস্যরা ঋণ শোধ না করলে সমবায়ের হাল ফিরবে না।’সমবায়ের তথ্য বলছে, ‘নন্দীগ্রাম-২ ব্লক তৃণমূলের কোর কমিটির সদস্য সাতেঙ্গাবাড়ি গ্রামের শেখ কাজেহার ২০১৮ সালের ৪ মে ওই সমিতি থেকে ৭০ হাজার টাকা লোন নেন। তারপর ছ’বছর সময় কেটে গিয়েছে। সেই টাকার সুদ এখন দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজার ৬৭৮ টাকা। কাজেহার ঋণখেলাপিদের মধ্যে একজন। আমদাবাদ-২ অঞ্চল তৃণমূলের প্রাক্তন সভাপতি সাতেঙ্গাবাড়ি গ্রামের মীর রওশন আলি ৮৮ হাজার টাকা লোন নিয়েছেন। তারপর আর সমবায়ের ধারেকাছে ঘেঁষেননি। এই মুহূর্তে সুদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৬ হাজার টাকা। ওই নেতার ছেলে সামসুর আলিও ৩৬ হাজার টাকা লোন নিয়ে ডিফল্ডার হয়েছেন। কিয়াখালি গ্রামের বিজেপি নেতা প্রভাশিস দাস ৪১ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছেন। কানাকড়িও পেমেন্ট করেননি। সুদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৩ হাজার ৫০০ টাকা।একইভাবে কিয়াখালি গ্রামের রাজনৈতিক কর্মী সিদ্ধার্থ জানা, ওই গ্রামের বিজেপি কর্মী গৌতম দাস ও তাঁর ভাই চন্দ্রমোহন দাসও লোন নিয়ে কার্যত বেপাত্তা। গৌতম দাস ২০১৪ সালে ৪৫ হাজার টাকা লোন নিয়েছিলেন। এখন তার সুদ দাঁড়িয়েছে ৫৬ হাজার টাকা। চন্দ্রমোহনের লোনের পরিমাণ ছিল ৩২ হাজার টাকা। এখন সুদের পরিমাণ ৩৩ হাজার টাকা। ওই গ্রামের তৃণমূল নেতা ঋষিকেশ দাস ২০১৭ সালে ৪০ হাজার টাকা লোন নেন। এখন সুদ হয়েছে ৩৪ হাজার টাকা। অরবিন্দ মণ্ডল একজন সিপিএম নেতা। জমি আন্দোলনের সময় থেকে ঘরছাড়া ছিলেন। এখনও এলাকায় তাঁকে দেখা যায় না। ২০০০ সালে ওই সমবায় থেকে ১২ হাজার টাকা লোন নিয়েছিলেন। শোধ করেননি। এখন সুদের পরিমাণ ২৩ হাজার টাকা। প্রাক্তন ম্যানেজার নিরাপদবাবু ১ লক্ষ ছ’হাজার টাকা লোন নিয়েছিলেন। শুধুমাত্র ইন্টারেস্ট দাঁড়িয়েছে ৮৭ হাজার টাকা। তিনিও ঋণখেলাপিদের তালিকায়।জানা গিয়েছেষ ২০১৮ সালে বোর্ডের মেয়াদ শেষ হয়। প্রায় সাত বছর অভিভাবকহীন ছিল সমবায়। চলতি বছরের গত ১৬ জানুয়ারি সমবায় সমিতির নির্বাচন হয়। তৃণমূল জয়লাভ করে। এখনও নতুন বোর্ড গঠিত হয়নি। স্বাভাবিকভাবেই নয়া বোর্ডের কাছে সমবায়ের হাল ফেরানোই মস্তবড় চ্যালেঞ্জ। কাজেহার বলেন, ‘আমি লোন নিয়ে ডিফল্ডার হয়েছি, একথা ঠিক। তবে, সমবায়ের হাল ফেরাতে সকলকে উদ্যোগী হতে হবে। আমি জমি বিক্রি করে বকেয়া টাকা শোধ করব।’ বিজেপি নেতা প্রভাশিস দাস বলেন, ‘সমবায় থেকে লোন নেওয়ার পর একজন সেই টাকা ধার নেয়। তিনি আর টাকা মেটাননি। আমিও শোধ দিতে পারিনি। তবে, আমি ঋণের টাকা শোধ দিয়ে দেব।’
  • Link to this news (বর্তমান)