আচমকা মৃত্যু জেঠিমার, মৃতদেহ ফ্রিজারে রেখে বিয়ে ইঞ্জিনিয়ার যুবকের
বর্তমান | ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
কাজলকান্তি কর্মকার, ঘাটাল: মৃত্যু কি জীবনের চাকাকে থামিয়ে দিতে পারে? রীতি, সংস্কার আর কঠিন বাস্তবের মাঝে দাঁড়িয়ে দিকভ্রান্ত পথিক হয়ে গিয়েছিল পশ্চিম মেদিনীপুরের দাসপুরের আলু পরিবার। শেষে পথ বাতলে দিল সংস্কারের পাল্টা সংস্কারই। যেখানে মৃত্যুর চেয়েও জীবনের চাকার গতিকেই বড় করে দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ, কোনও মৃত্যুই জীবনকে থমকে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে না। অতঃপর, নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিল আলু পরিবার। বাড়ির ইঞ্জিনিয়ার ছেলের বিয়ের আয়োজনের মাঝে হঠাৎ হৃদরোগে মৃত্যু জেঠিমার। দেহটি ফ্রিজারে রেখেই সাতপাকে বেঁধে দিলেন ছেলেকে! কান্না-হাসি, বিষাদের সুরে মিশে যাওয়া সানাইয়ের সুর—সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী দু’টি ঘটনার সাক্ষী থাকল পাড়া-প্রতিবেশিরা। কেউ কেউ একরাশ বিস্ময়ের সঙ্গে বললেন, ‘এমনও হয়!’ কেউ কেউ আবার বললেন, ‘জীবনের কঠিন বাস্তব হল মৃত্যু। তার চেয়েও আরও কঠিন বাস্তব জীবনের ছন্দকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। সেটাই সাহসের সঙ্গে করে দেখিয়েছেন আলু পরিবারের সদস্যরা।’দাসপুর থানার চাঁইপাটে বাস আলু পরিবারের। বেশ কয়েকমাস ধরেই চলছে বাড়ির কৃতী ছেলে সৌরিনের বিয়ের আয়োজন। মঙ্গলবার রাতে বিয়ে। সোমবার সকালেই জেঠিমা রিতা আলু (৫০) হঠাৎই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন বাড়ির সকলেই। রিতাদেবী নিথর দেহটি খাটিয়ায় শায়িত। বিয়ের আয়োজনও সম্পূর্ণ। অদ্ভুত এক ধর্মসঙ্কটে পড়ে যায় পরিবারটি। উপায় খুঁজতে দৌড়ঝাঁপ শুরু হয় ব্রাহ্মণ-বৈষ্ণব পণ্ডিতদের কাছে। তাঁরা বিধান দেন, হিন্দুশাস্ত্র মতে মৃত্যু মানেই অশৌচ নয়। দেহ দাহ করার মুহূর্ত থেকে অশৌচকাল গণনা শুরু হয়। অতএব, সৎকার না করে গৃহে শুভ অনুষ্ঠান করা যেতেই পারে। হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন সৌরিনের বাড়ির লোকেরা। গ্রামের লোকেরাও পণ্ডিতদের মতে সায় দেন। ঠিক হয়, জেঠিমার দেহ ফ্রিজারে রেখে বিয়ে হবে। পাত্রীর বাড়িও এমন সিদ্ধান্তে রাজি। সেই মতো ফ্রিজার ভাড়া করে এনে তাতে রেখে দেওয়া হয় দেহটি। মৃত্যুশোক সাময়িক ভুলে মঙ্গলবার রাতেই বিয়ের আনন্দে মেতে ওঠে আলু পরিবার। সমাজের অতি রক্ষণশীলরা বিষয়টিকে তীর্যকভাবে দেখলেও অনেকেই পরিবারের সিদ্ধান্তকে কুর্নিশ জানিয়েছেন। কেননা, এরকম পরিস্থিতি আজ সৌরিনের ক্ষেত্রে হয়েছে, কাল অন্য কারও ক্ষেত্রে হতে পারে। আর সম্পূর্ণ হয়ে যাওয়া বিয়ের আয়োজন পিছিয়ে দেওয়া মানেই লক্ষ লক্ষ টাকা ক্ষতি, আত্মীয়-স্বজনদের হয়রানি। সেদিক দিয়ে আলু পরিবারের পদক্ষেপ দৃষ্টান্ত স্থাপন করল বলেই সমর্থনকারীদের মত।গ্রামবাসী কিরণ মণ্ডল, সন্দীপ বেরারা বলছিলেন, ‘শাস্ত্রমতেই সবকিছু হয়েছে। আজ, বুধবার রাতে প্রীতিভোজ। সেটা শেষ হওয়ার পরেই রিতাদেবী সৎকার হবে।’ আলু পরিবারের সদস্যরাও একযোগে বলছিলেন, ‘সৌরিনের জেঠিমা আনন্দ-উৎসবের মধ্যেই কাটাতেন। তিনি কখনও চাইতেন না কোনও কঠিন পরিস্থিতিতে আনন্দানুষ্ঠান পণ্ড হোক। আশাকরি, পরলোকে গিয়েও তিনি নবদম্পতিকে আশীর্বাদই করবেন।’ সৌরিনের বাবা সরোজ আলুর কথায়, ‘বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর। তাই এনিয়ে আমি নিজে কিছু সিদ্ধান্ত নিইনি। পণ্ডিতজন, গ্রামবাসী এবং পরিজনরা যেটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, সেটা মেনে ছেলের বিয়ে হয়েছে।’জীবনের শেষযাত্রার আগে জীবনের চাকা গড়ানোর চালিকাশক্তি হিসেবে সমাজে বেঁচে থাকলেন রিতাদেবী।