নিজস্ব প্রতিনিধি, রানাঘাট: জন্ম থেকেই দু’হাতের একটিও আঙুল নেই। জিহ্বার সমস্যার কারণে স্পষ্ট উচ্চারণেও বাধা। তবুও, জীবনে হার মানতে রাজি নয় শান্তিপুরের বর্ষা। বরং নিজের স্বপ্নপূরণে অবিচল সে। রাধারানি নারী শিক্ষা মন্দিরে পড়ে বর্ষা শর্মা। মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী। স্বপ্ন দেখে দেশের আমলা হওয়া। ফলে, সব প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে সে এগিয়ে যেতে চায়। আঙুলহীন হাতে লিখে যায়। দীর্ঘ অধ্যাবসায়ের পর অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলেছে শান্তিপুরের বর্ষা। একসময় কলম ধরতে গিয়ে বারবার ব্যর্থ হয়েছে। একরাশ বিরক্তি নিয়ে থামাতে হয়েছে তাকে। এখন তার হাতে কলমই থামতে চায় না। প্রশ্নপত্র পেলেই ঝড়ের গতিতে লিখতে শুরু করে। কথা বলার ক্ষেত্রেও বর্ষার ভীষণ সমস্যা। সেটাও তার জীবনযুদ্ধে অন্যতম বাধা। জেদ আর অধ্যাবসায়ের মধ্যে সেই বাধাকেও টপকাতে চায় সে। বর্ষার হাতের সমস্যার কারণে ‘রাইটার’ নেওয়ার সুবিধা ছিল। সেটা গ্রহণ করেনি। নিজের উপর অগাধ আস্থা রেখেই পরীক্ষার উত্তরপত্রে লিখে চলেছে বর্ষা। যদিও বোর্ডের পক্ষ থেকে বাড়তি কিছু সময় দেওয়া হয়েছে তাকে।বর্ষার বাবা মনোজিত শর্মা পেশায় তাঁতশিল্পী। শাড়ি তৈরির কারখানাই পরিবারের মূল রুজিরুটির উৎস। সীমিত আয়ের মধ্যেই মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। মনোজিতবাবুর কথায়, ‘মেয়ে ভবিষ্যতে কী হবে, সেটা বড় কথা নয়। ও যেন একজন ভালো মানুষ হতে পারে। এটাই আমাদের স্বপ্ন। আমরা দিনরাত লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি ওকে মানুষ করার জন্য। ওর চেষ্টাও সত্যিই আমাদের অবাক করে।’ শুধু বাবাই নন, গোটা পরিবার ও পরিজনদের থেকেই বর্ষা পেয়েছে নিরন্তর সমর্থন ও সাহস। বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকারাও বর্ষার মানসিক জেদের প্রশংসা করেন অনবরত। তাঁদের মতে, শারীরিক সীমাবদ্ধতা কখনও বর্ষার আত্মবিশ্বাস ভাঙতে পারেনি। বরং প্রতিকূলতাই তাকে আরও দৃঢ় করেছে। পড়াশোনার পাশাপাশি জীবনের নানা বিষয়ে সে সচেতন ও সংবেদনশীল। বর্ষার কথায়, ‘ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় কোনও লক্ষ্য ঠিক করে রাখিনি। আগে মানুষ হতে চাই। তবে, সুযোগ পেলে আইএএস অফিসার হব। যাতে সমাজের জন্য কিছু করতে পারি।’ বর্ষার এই লড়াই শুধু ব্যক্তিগত নয়, সমাজের জন্যও এক অনুপ্রেরণা। যাঁরা অন্তত নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে জানেন।• নিজস্ব চিত্র