জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: চিন–বাংলাদেশ সীমান্তঘেঁষা শিলিগুড়ি করিডরে প্রায় ৪০ কিমি ভূগর্ভস্থ রেললাইন, বদলে যাচ্ছে ভারতের স্ট্র্যাটেজিক গেমপ্ল্যান...
ভারতের মানচিত্রে এক সরু করিডর—চওড়ায় কোথাও মাত্র ২০ কিলোমিটার। নাম শিলিগুড়ি করিডর, পরিচিত ‘চিকেন’স নেক’ নামে। সেই সংবেদনশীল ভূখণ্ডের নীচ দিয়েই এবার ভূগর্ভস্থ রেললাইন তৈরি করার পরিকল্পনা করছে কেন্দ্র। লক্ষ্য—উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে দেশের মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ আরও সুরক্ষিত ও অটুট রাখা।
কেন এই করিডর ভারতের ‘নার্ভ সেন্টার’
উত্তর-পূর্বের আটটি রাজ্যের সঙ্গে দেশের একমাত্র স্থল সংযোগ এই করিডর দিয়েই। দক্ষিণে বাংলাদেশ, উত্তরে ভুটান ও চীন সীমান্ত—ভৌগোলিক অবস্থানই একে জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিতে অত্যন্ত স্পর্শকাতর করে তুলেছে। কোনও যুদ্ধ, সন্ত্রাসী হামলা বা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে এই করিডর ক্ষতিগ্রস্ত হলে উত্তর-পূর্ব কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
কী পরিকল্পনা করছে কেন্দ্র
সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রায় ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ ভূগর্ভস্থ রেল করিডর তৈরি হবে এই অঞ্চলে। রেললাইন যাবে ২০–২৪ মিটার মাটির নীচ দিয়ে। বিদ্যমান ওপেন ট্র্যাকের পাশাপাশি এই আন্ডারগ্রাউন্ড রুট যুক্ত হলে পুরো এলাকায় তৈরি হবে মাল্টি-লেয়ার রেল নেটওয়ার্ক।
কেন মাটির নীচে রেল
ভূগর্ভস্থ রেলপথের সুবিধা একাধিক—
শত্রুপক্ষের নজরদারি ও ড্রোন হামলার ঝুঁকি কম
ওপেন ট্র্যাক ক্ষতিগ্রস্ত হলেও যোগাযোগ অটুট
সেনা, অস্ত্র ও ভারী রসদ দ্রুত পাঠানো সম্ভব
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রেললাইন আসলে অদৃশ্য নিরাপত্তা ঢাল।
সামরিক বাস্তবতা ও ভূ-রাজনীতি
ডোকলাম অভিজ্ঞতা, সীমান্তে চীনের পরিকাঠামো বৃদ্ধি এবং প্রতিবেশী দেশগুলির রাজনৈতিক অস্থিরতা—সব মিলিয়ে শিলিগুড়ি করিডরের গুরুত্ব বহুগুণ বেড়েছে। সেই প্রেক্ষিতেই এই ভূগর্ভস্থ রেল প্রকল্পকে দেখা হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রস্তুতি হিসেবে।
ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ পথ: উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাথে নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ বজায় রাখতে এই করিডোরটির একটি বড় অংশ মাটির নিচ দিয়ে তৈরি হবে। এটি কেবল সাধারণ যাত্রী পরিবহন নয়, বরং সামরিক সরঞ্জাম ও সৈন্য দ্রুত চলাচলের জন্য অত্যন্ত কার্যকর হবে।
বিকল্প পথ তৈরি: বর্তমানে এই অঞ্চলের ওপর দিয়ে মাত্র একটি প্রধান রেল সংযোগ রয়েছে। নতুন এই ভূগর্ভস্থ করিডোরটি একটি শক্তিশালী বিকল্প পথ হিসেবে কাজ করবে, যা শত্রুদেশের নজরদারি বা হামলা থেকে সুরক্ষিত থাকবে।
চিন ও বাংলাদেশ সীমান্তের নিরাপত্তা: এই প্রকল্প এমনভাবে ডিজাইন করা হচ্ছে যাতে চীন সীমান্তের কাছে অরুণাচল প্রদেশ এবং সিকিমে দ্রুত রসদ পৌঁছানো যায়। পাশাপাশি বাংলাদেশের সাথে সংলগ্ন সীমান্তের নিরাপত্তাও এর মাধ্যমে জোরদার হবে।
শুধু নিরাপত্তা নয়, উন্নয়নও
এই রেলপথ চালু হলে—
১. উত্তর-পূর্বে পণ্য পরিবহণ হবে দ্রুত ও সস্তা
২. শিল্প ও বাণিজ্যে গতি আসবে
৩. পর্যটন ও স্থানীয় কর্মসংস্থান বাড়বে
অর্থাৎ, নিরাপত্তা আর উন্নয়ন—দু’দিকেই লাভ।
রাজনীতি নয়, জাতীয় কৌশল
এই প্রকল্প পুরোপুরি কেন্দ্রীয় সরকারের স্ট্র্যাটেজিক উদ্যোগ। রেল, প্রতিরক্ষা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের যৌথ পরিকল্পনায় কাজ এগোচ্ছে। কোনও রাজ্য রাজনীতি বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে এর সরাসরি যোগ নেই।
শেষ কথা
চিকেন’স নেকের নীচে রেললাইন মানে ভারত স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে—
সংযোগ শুধু থাকলেই হবে না, সংযোগকে নিরাপদ রাখাই এখন জাতীয় অগ্রাধিকার।