• অগ্নিকন্যার অগ্নিবাণ...সুপ্রিম কোর্টে মমতার সওয়ালে কোণঠাসা কমিশন
    বর্তমান | ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • সন্দীপ স্বর্ণকার, নয়াদিল্লি: বেলা ১২টা ৫৪ থেকে ১টা ৩৮। ৪৪ মিনিটে ১১ বার বলার সুযোগ। আর তাতেই এসআইআর মামলার শুনানির মোড় ঘুরিয়ে দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর নামে দায়ের করা মামলায় বুধবার ভারতের নির্বাচন কমিশন এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য নির্বাচনি আধিকারিককে জবাব দেওয়ার নোটিস ইস্যু করল সুপ্রিম কোর্ট। জানিয়ে দিল, সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারি ফের শুনানি। তার মধ্যে দুই বিবাদীকে জবাব দিতে হবে। এখানেই শেষ নয়, পর্যবেক্ষণে কমিশনের উদ্দেশে বেশ কিছু কঠোর মন্তব্যও করেছেন দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত। লজিকাল ডিসক্রিপেন্সির নামে যেভাবে সাধারণ মানুষকে হয়রান করা হচ্ছে, সে ব্যাপারে কমিশনকে আরও সংবেদনশীল হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে শীর্ষ আদালত। নামের ছোটোখাটো ভুলের জন্য কোনো প্রকৃত ভোটারের নাম বাদ দেওয়া যাবে না। বিএলওদের স্বাক্ষর ছাড়া কোনও নথি বৈধ হবে না।একদিকে হয়রানি, অন্যদিকে ‘বিজেপি শাসিত রাজ্য থেকে ৮ হাজার ৩০০ মাইক্রো অবজার্ভার নিয়োগের অভিযোগ। তবে প্রক্রিয়া কোনোভাবে যে মানুষ ও রাজ্যের স্বার্থবিরোধী হবে না, তা এদিন স্পষ্ট করে দিয়েছে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি বিপুল এম পাঞ্চোলির বেঞ্চ। রাজ্য সরকারকে প্রধান বিচারপতির নির্দেশ, লজিকাল ডিসক্রিপেন্সিতে নামধাম পরীক্ষা করার কাজের জন্য অতিরিক্ত গ্রেড-টু লেভেল অফিসার কমিশনকে দিন। তাহলেই আর মাইক্রো অবজার্ভারদের দরকার পড়বে না। মমতার মুখে বাংলায় এসআইআরের চিত্র জেনে প্রধান বিচারপতি বলেন, প্রয়োজনে আমরা সময়সীমা বাড়িয়ে দিতে পারি। আর আদালতের এই মনোভাবে কার্যত কোণঠাসা হয়ে পড়ে নির্বাচন কমিশন। আইনজীবী রাকেশ দ্বিবেদী, ডি এস নাইডু, সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আত্মপক্ষ সমর্থনে বলার চেষ্টা করেও মমতার সওয়ালের সামনে থই পেলেন না। মমতা এদিন একটা বিষয় প্রথমেই স্পষ্ট করে দিয়েছেন—মুখ্যমন্ত্রী বা তৃণমূল নেত্রী নন, দেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসাবে মানুষের কথা বলতে এসেছেন তিনি। আর এই ‘আম আদমি’র প্রত্যয়ই ঢুকে গেল ইতিহাসের পাতায়। কারণ, এর আগে পদে থাকা কোনও মুখ্যমন্ত্রী শীর্ষ আদালতে সওয়াল করেননি। মমতা নিজেকে একজন ‘বন্ডেড লেবার, সাধারণ ঘরের, লেস ইম্পর্ট্যান্ট মানুষ’ বলেও বর্ণনা করেন এজলাসে। দেশের প্রধান বিচারপতির সামনে বলেন, ‘আমাকে পাঁচ মিনিট সুযোগ দিন।’ যদিও প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তর তৎক্ষণাৎ জবাব, ‘ম্যাডাম মমতা ব্যানার্জি... পাঁচ মিনিট কেন, ১৫ মিনিট সময় দেব। আপনার কথা শুনব।’আদালতের কাছে আগেই এ ব্যাপারে অনুমোদন চেয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। গণতন্ত্রই ভারতের ভিত, তা প্রমাণে সেই অনুরোধেও অনুমোদন দিলেন দেশের প্রধান বিচারপতি। এসআইআর ইস্যুতে সুপ্রিম কোর্টে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ১৪টি বিষয়ে আর্জি ছিল। তার মধ্যে অন্যতম, ২০২৫ সালের ইলেক্টোরাল রোল মেনেই বাংলায় আসন্ন অষ্টাদশ বিধানসভার ভোট। নামের বানানে সামান্য ভুল মাফ, মাইক্রো অবজার্ভার প্রত্যাহার, লজিকাল ডিসক্রিপেন্সির নামে হেনস্তা বন্ধ ইত্যাদি।গোড়ায় এসআইআর ইস্যুতেই কবি জয় গোস্বামীর মামলায় সওয়াল শুরু করেন আইনজীবী শ্যাম দিওয়ান। তবে ঘড়ির কাঁটা বেলা ১টার দিকে এগতে দেখে মমতার আর্জি, ‘আমায় কিছু বলতে দিন।’ শুনানি শেষ করেন প্রধান বিচারপতি। বেলা ১টা ১৩ মিনিটে বলার সুযোগ পান মমতা। বলেন, ‘বাংলাকে টার্গেট করা হয়েছে। বিজেপি শাসিত রাজ্য থেকে অফিসার এনে প্রকৃত ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। এসআইআরে নাম যুক্ত করা নয়, নাম বাদ দেওয়াই কমিশনের উদ্দেশ্য। তাই করজোড়ে প্রার্থনা, গণতন্ত্র বাঁচান। সেভ ডেমোক্রেসি। প্রোটেক্ট পিপলস রাইট।’ মমতা বলেন, ‘মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে ছ’টি চিঠি দিয়েছি। কিন্তু কোনো উত্তর পর্যন্ত দেওয়া হয়নি।’ সওয়াল করতে গিয়ে মমতা বলেন, ‘ওরা বাংলাকে বুলডোজ করতে চায়। অসমে কেন এসআইআর হচ্ছে না? সামান্য নামের বানানে হেরফের হলেই ভোটার থাকতে পারবে না?’মমতার এই সওয়াল শুনে প্রধান বিচারপতিও বলেন, ‘ঠিকই। বাংলায় অনেক সময়ই নামের উচ্চারণ অনুযায়ী বানানে ফারাক হয়। ইংরেজিতে ভিপুল, বাংলায় বিপুল। রয়, গাঙ্গুলি, দত্ত, ব্যানার্জি বানানেও এরকম হয়। তবে এর জন্য প্রকৃত ভোটারকে হয়রান করা ঠিক নয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের টেগোর বানান অনেকেই নানাভাবে লেখেন। তা বলে কি রবীন্দ্রনাথ বদলে যাবেন?’ আদালতের এই মন্তব্যে কমিশনের প্রতি কটাক্ষ ছিল স্পষ্ট। এবং একটি বার্তাও—প্রক্রিয়ায় যেন গলদ না থাকে।
  • Link to this news (বর্তমান)