শ্যামলেন্দু গোস্বামী, বারাসত: বনগাঁ মহকুমায় দু’লক্ষেরও বেশি মানুষ পেয়েছেন এসআইআরের হিয়ারিং নোটিস। এখনও পর্যন্ত তারমধ্যে প্রায় ৬০ হাজার মানুষ অংশ নিয়েছেন হিয়ারিংয়ে। কমিশন সূত্রের খবর, নোটিস যে বা যাঁরা পেয়েছেন, তাঁদের সিংহভাগই মতুয়া জনগোষ্ঠীর। ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় এঁদের নাম ছিল না। এবারের এসআইআরে যে ১৩টি নথিকে আবশ্যক করেছে কমিশন, প্রয়োজনীয় সেই সমস্ত কাগজও নেই তাঁদের কাছে। একদিকে অনিশ্চয়তায় ঝুলছে নাগরিকত্বের টোপ, অন্যদিকে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়াটা এখন সময়র অপেক্ষা। ধর্মীয় কারণে বাংলাদেশ থেকে ভারতে আশ্রয় নেওয়া মানুষের চিন্তা ক্রমশ বাড়ছে। নাগরিকত্ব হবেই, তারপর ভোটার হিসেবে নামভুক্তি—পদ্মপার্টির বিলি করা এই আশ্বাসকে আঁকড়েই মতুয়াদের সিংহভাগ হিয়ারিং এড়াচ্ছেন বলে ওয়াকিবহাল মহলের মত।ভোটার তালিকার শুদ্ধকরণ পর্বে বনগাঁ মহকুমার যে বাসিন্দারা এখন ‘দুশ্চিন্তা’য়, বাংলাদেশ থেকে উৎখাত হয়ে এসে তাঁরাই গত ১০-১৫ বছর বা তারও কিছু বেশি সময় ধরে ভারতের মূল স্রোতেই রয়েছেন। ভোটার কার্ড বানিয়েছেন, ভোটও দিয়েছেন। রেশন, আধার এমনকি রয়েছে প্যান কার্ডও। গত ১১ বছরের বেশি সময় ধরে গেরুয়া শিবিরের তরফে একটাই আশ্বাস বারবার মিলছে—মতুয়া ও উদ্বাস্তু পরিবাররা চিন্তামুক্ত থাকবেন। নাগরিকত্ব নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না। ভোটপর্বে বাংলায় ডেইলি প্যাসেঞ্জারি শুরু করা বিজেপির দিল্লির নেতারাও নিয়ম করে ‘অভয়বাণী’ বিলি করে যাচ্ছেন। কিন্তু সেই ‘অভয়বাণী’ এখন দুশ্চিন্তায় পরিণত হয়েছে। গ্যাঁটের কড়ি খরচ করে মতুয়া কার্ড জোগাড় হলেও, নাগরিকত্ব পর্বে তা গুরুত্ব পায়নি। ভারতীয় ভোটার তালিকায় এবার নাম থাকাটাও ‘সোনার পাথর বাটি’। এই আবর্তেই নির্বাচন দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, বনগাঁ মহকুমার চারটি বিধানসভাতে ২ লক্ষ ১৭ হাজার ৭২২ জন ভোটারকে হিয়ারিংয়ের নোটিস দেওয়া হয়েছে। শুনানিতে হাজির হয়েছেন ৫৯ হাজার ৮৭৫ জন। যে সমস্ত ভোটারকে শুনানির নোটিস পাঠানো হয়েছে, তাঁদের সিংহভাগের নাম বা তাঁদের পরিবারের নাম ২০০২ সালের তালিকায় নেই, অর্থাৎ নো-ম্যাপিং। তবে এখানে সন্দেহজনক ভোটারের সংখ্যাটা তুলনামূলক কম।জানা গিয়েছে, বাগদা বিধানসভায় ৬০ হাজার ৯২৬ জনকে নোটিস পাঠানো হয়েছে। তার মধ্যে ২১ হাজার ৬২৮ জন এসেছেন হিয়ারিংয়ে। বনগাঁ উত্তর বিধানসভার ক্ষেত্রে ৫৪ হাজার ৪৯৩ জনকে নোটিস পাঠানো হয়েছে। মাত্র ১০ হাজার ৬৩ জন শুনানিতে এসেছেন। বনগাঁ দক্ষিণে ৪৭ হাজার ৮৮৯ জনের মধ্যে ১২ হাজার ১০৩ এবং গাইঘাটা বিধানসভার ক্ষেত্রে ৫৪ হাজার ৪০৪ জনের মধ্যে ১৬ হাজার ৮১ জনের হিয়ারিং হয়েছে। হিয়ারিংয়ে উপস্থিত না হওয়ার পিছনে শুধু ‘কাগজ’ না থাকাটাই নয়, পেটের তাগিদও রয়েছে। গিয়েও যেহেতু কোনও লাভ নেই, তাই দিন আনা দিন খাওয়া মানুষ একদিনের রোজগারটা হারাতে চাইছেন না। গত কয়েক বছর ধরে যাঁরা ভোটব্যাংক হিসেবে আমানত বাড়িয়েছেন, তাঁদের এবারের অনীহায় চিন্তা বেড়েছে বিজেপি শিবিরেও। বনগাঁর বিভিন্ন প্রান্তে এখন পদ্মপার্টির তরফে প্রচার চালানো হচ্ছে—বিধানসভা নির্বাচনের আগেই কেন্দ্র সরকার এমন ‘কিছু’ করবে, যাতে মতুয়াদের নাগরিকত্ব মেলাটা সহজ হবে।এ নিয়ে তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ মমতা ঠাকুর বলেন, মতুয়াদের নাগরিকত্ব নিয়ে বিজেপি বড় বড় কথা বলেছিল। ভোট নিয়ে প্রতারণা করেছে বিজেপি। এসআইআরে বিধ্বস্ত হচ্ছেন মতুয়ারা। কেন্দ্রের মন্ত্রীরা এসে অভয় দিচ্ছেন। কিন্তু কীভাবে মতুয়াদের ভয় কাটবে, তা স্পষ্ট করছেন না। এই বিষয়ে বনগাঁ সাংগঠনিক জেলা বিজেপির সভাপতি বিকাশ ঘোষকে ফোন করা হলে, তাঁর কোনও প্রতিক্রিয়া মেলেনি।