• র‌্যামজেট প্রযুক্তি মিসাইলের পরীক্ষামূলক উড়ান সফল
    এই সময় | ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • কুবলয় বন্দ্যোপাধ্যায়

    ‘টেন, নাইন, এইট, সেভেন ...’ কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গিয়েছিল ওডিশার চাঁদিপুর ইন্টিগ্রেটেড টেস্ট রেঞ্জ–এ। সময় সকাল ১০টা ৪৫।

    কাউন্টডাউন ‘জ়িরো’–তে এসে পৌঁছনোর পরে একটা খণ্ডমুহূর্তের নিস্তব্ধতা। তার পরেই প্রবল শব্দে সমুদ্রের দিকে উড়ে গেল একটা মিসাইল। পার হয়ে গেল আরও কয়েকটা সেকেন্ড। ধোঁয়ার একটা লম্বা রেখা ওই ক্ষেপণাস্ত্র–র গমনপথের সাক্ষী হয়ে থাকল কিছুক্ষণ। তারপরে আর কোনও চিহ্নই রইল না।

    চাঁদিপুরে ডিফেন্স রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজ়েশন (ডিআরডিও)–এর কন্ট্রোল রুমে তখন পরস্পরকে অভিনন্দনের বন্যা। মঙ্গলবার সকালে ওডিশায় দূরপাল্লার মিসাইলের প্রপালশন সিস্টেম বা চালিকাশক্তি–ব্যবস্থায় যে সাফল্য অর্জন করলেন ভারতীয় বিজ্ঞানীরা, পৃথিবীর খুব কম দেশই সেই সাফল্য পেয়েছে। এই প্রযুক্তি হলো সলিড ফুয়েল ডাক্টেড র‌্যামজেট (এসএফডিআর)। এর ফলে ভারত যে কোনও ক্ষেপণাস্ত্রকে শব্দের সাড়ে চার গুণ গতিতে (ম্যাক ৪.৫) উড়িয়ে নিয়ে ৫০ থেকে ৩৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত দূরের কোনও লক্ষ্যবস্তুকে নিখুঁত ভাবে আঘাত হানার ক্ষমতা অর্জন করল। বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, শব্দের সাড়ে চার গুণ গতিতে অর্থাৎ ঘণ্টায় ৫ হাজার ৫৫৮ কিলোমিটার গতিতে উড়ে গিয়ে ৩৫০ কিমি দূরের টার্গেটে পৌঁছতে ক্ষেপণাস্ত্রর সময় লাগবে মাত্র ৩ মিনিট ৪৭ সেকেন্ড।

    ২০২৫–এ অপারেশন সিঁদুরের পরে ভারতের প্রতিরক্ষা খাতে বাজেট বিপুল পরিমাণে বেড়েছে। অস্ত্রের জন্য বিদেশের উপরে নির্ভরশীলতা কমাতে গত কয়েক বছর ধরেই চেষ্টা চলছে দেশে। ইতিমধ্যেই ভারত ও রাশিয়ার মিলিত উদ্যোগে তৈরি ব্রাহ্মস মিসাইল গোটা দুনিয়ায় সাড়া ফেলেছে। এর পরে ডিআরডিও–র তৈরি মাল্টি ব্যারেলড রকেট লঞ্চার ‘পিনাক’ ব্যবহার করে আজ়ারবাইজানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে রীতিমতো সাফল্য পেয়েছে আর্মেনিয়া। এই পরিস্থিতিতে এসএফডিআর প্রপালশন ব্যবহার করে মিসাইলের এমন সফল উৎক্ষেপণ ভারতীয় বিজ্ঞানীদের কাছে অত্যন্ত উৎসাহের।

    এসএফডিআর প্রযুক্তি সম্পর্কে বলতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, এটি হলো এমন একটি প্রপালশন সিস্টেম, যেটা এয়ার–টু–এয়ার মিসাইলকে আরও বেশি করে অপ্রতিরোধ্য করে তুলবে। আকাশযুদ্ধের সময়ে ভারতীয় ফাইটার প্লেনগুলোকে এই প্রপালশন সিস্টেম ‘বিয়ন্ড ভিজ়ুয়াল রেঞ্জ’ অর্থাৎ দৃষ্টিসীমার বাইরের যুদ্ধে প্রতিপক্ষের চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে রাখবে। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, একটি এসএফডিআর–চালিত মিসাইল ওড়ার সময়ে বাতাসের অক্সিজেন ব্যবহার করেই তার জ্বালানির দহন প্রক্রিয়া সচল রাখে। এই প্রযুক্তি মিসাইলটিকে দীর্ঘ সময় ধরে শব্দের চেয়েও দ্রুত গতিতে উড়ে যেতে এবং অনেক দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সাহায্য করে।

    সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে শুরু করে ২০ কিমি উচ্চতা পর্যন্ত বিরাট ব্যবধানের উচ্চতায় এই ধরনের প্রযুক্তি অত্যন্ত কার্যকরী। এতে ১০ কিমি পর্যন্ত ‘ভার্টিক্যাল স্ন্যাপ-আপ’ বা ‘স্ন্যাপ-ডাউন’–এর ক্ষমতা রয়েছে। একই সঙ্গে এই সিস্টেম লক্ষ্যবস্তুর পালানোর পথ বন্ধ করতে একটি বিস্তীর্ণ ‘নো-এস্কেপ জ়োন’, পিছু ধাওয়া করার জন্য শক্তিশালী ‘টেল-চেজ়’ এবং হঠাৎ বাঁক নেওয়ার ক্ষমতা ‘জি’ ম্যানুভারিং রাখে। এর ফলে শত্রুপক্ষের বিমানের পক্ষে এই ধরনের মিসাইল এড়িয়ে পালানো বা ফাঁকি দেওয়া প্রায় অসম্ভব।

    এতদিন ধরে আমেরিকা, রাশিয়া, ফ্রান্স এবং চিন ছাড়া অন্য কোনও দেশই মিসাইলের চালিকাশক্তি হিসেবে সলিড ফুয়েল ডাক্টেড র‌্যামজেট প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারেনি। মঙ্গলবার চাঁদিপুরে ভারতের এই সাফল্য তাকে ওই দেশগুলোর সঙ্গে এক সারিতে দাঁড় করিয়ে দিল।

  • Link to this news (এই সময়)