সমৃদ্ধ দত্ত, নয়াদিল্লি: সংসদের অধিবেশন চলাকালীন দিল্লিতে এসে এসআইআরের বিরোধিতায় সুপ্রিম কোর্টে ‘সওয়াল’ করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নির্বাচন কমিশনের নাকের ডগায় হওয়া এই ঐতিহাসিক ঘটনা গোটা দেশে আলোড়ন ফেলে দিয়েছে। এমনকী বাংলার মুখ্যমন্ত্রী যে মোদি সরকারকেও যথেষ্ট দিশাহারা করে দিতে সমর্থ হয়েছেন, তার প্রমাণ পাওয়া গেল বৃহস্পতিবার রাজ্যসভায় স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে। ‘রাষ্ট্রপতির অভিভাষণের বাইরের কোনো ইস্যু নিয়ে বলা যাবে না’, এই মর্মে লোকসভায় রুলিং দিয়ে বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীকে বক্তব্য রাখতে দেননি স্পিকার ওম বিড়লা। অথচ অভিভাষণের সঙ্গে সম্পর্কহীন এসআইআর নিয়ে তৃণমূল সুপ্রিমোর সুপ্রিম কোর্ট অভিযান প্রসঙ্গ রাজ্যসভায় টেনে আনলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। নাম না নিয়ে তীব্র কটাক্ষ করলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। বিরোধীরা তার আগেই ওয়াক আউট করেছে। অতএব বিরোধীশূন্য রাজ্যসভায় তৃণমূল ও পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে একতরফা আক্রমণ শানালেন মোদি। তৃণমূল এমপিরা তাঁর সরকারের সমালোচনা করেছেন—রাজ্যসভায় আলোচনায় এই প্রসঙ্গ তুলে মোদি এদিন বলেন, ‘বাংলায় এক নির্মম সরকার চলছে। তূণমূল অধঃপতনের সব রেকর্ড ভেঙে চলেছে। অন্ধকারে ডুবছে মানুষ। অন্ধকারে রাজ্য। মহিলাদের নিরাপত্তা নেই। ঘোরতর অনুপ্রবেশ সমস্যা।’ মমতার সুপ্রিম কোর্ট সওয়াল যে বাংলায় ও দেশে একটি প্রধান চর্চায় পরিণত হয়েছে এবং দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিযোগিতায় মমতা বিপুল লাভ করেছেন, সেটাও মোদি বিলক্ষণ উপলব্ধি করেছেন। সেই সূত্রেই তিনি বলেন, ‘দুনিয়ার উন্নত দেশ বেআইনি নাগরিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে। আর আমাদের দেশে অনুপ্রবেশকারীদের বাঁচাতে আদালতের উপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। অনুপ্রবেশকারীরা আমাদের যুবসমাজের পেশা দখল করছে।’ এরপরই মোদির শায়েরি, ‘তুমকিতনা দুনিয়া কো ধোঁকা দোগে,আয়না দেখ লিয়া তো আপনি সাচ্চাই কাহা ছুপাওগে।’মোদির বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে তৃণমূল। দলের তরফে এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, ‘বিজেপিকে সাহায্য করতে এসআইআরের নামে যে প্রহসন নামিয়েছে নির্বাচন কমিশন, তাতে দেড়শোর বেশি মানুষ মারা গিয়েছেন। এক কোটিরও বেশি মানুষকে এসআইআরের নামে হেনস্তা করা হচ্ছে। তারা সবাই অনুপ্রবেশকারী? বাংলা ও বাঙালিকে অপমান করার এত বড়ো সাহস মোদির হয় কীভাবে!’বুধবার কংগ্রেসের প্রবল প্রতিবাদের জেরে লোকসভায় বক্তব্য রাখতে পারেননি মোদি। সেই ঘটনাকে প্রধানমন্ত্রী এদিন ‘সংবিধানের অসম্মান’ তকমা দিয়েছেন। নিজেই নিজের সম্পর্কে বলেছেন, ‘মোদিকে অপমান করা মানবিকতার অপমান। সংবিধানের অপমান। ২৫ বছর ধরে এমন কোনও সংসদের অধিবেশন ছিল না, যেখানে মোদিকে অপমান করা হয়নি। আমাকে প্রশ্ন করা হয়, আপনার সাফল্যের কারণ কী? আমি উত্তর দিয়েছি, আমি ২ কিলো গালিগালাজ খাই প্রতিদিন। কোটি কোটি মানুষের আশীর্বাদ যাঁর সঙ্গে আছে, তাঁর কবর খোঁড়া সম্ভব নয়।’ একইসঙ্গে গান্ধী পরিবারকে টার্গেট করে মোদির তোপ, ‘যারা মহাত্মা গান্ধীর পদবি চুরি করে নেয়, তাদের কাছে এর থেকে বেশি আশা করা যায় না।’ নরেন্দ্র মোদির বক্তৃতায় বিগত কয়েক বছরে সামান্যতম বদল ঘটেনি। একটিও নতুন কথা বলেননি এদিন। সেই ইন্দিরা গান্ধী, জওহরলাল নেহরুর সমালোচনা। সেই অপারেশন সিন্দুর, ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ, মাওবাদী সমস্যার সমাধানের দাবি। ব্যাঙ্কিং সেক্টর থেকে গরিবের উন্নয়ন সবই তাঁর আমলে হয়েছে ইত্যাদি।সদ্য বাজেটে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সরকারি সংস্থা বিক্রি করে ৮০ হাজার কোটি টাকা আয় করা হবে আগামী আর্থিক বছরে। অথচ রাজ্যসভায় মোদি বলেন, বিগত ১০ বছরে সরকারি সংস্থার সাফল্য চোখ ধাঁধানো। এমনকী সরকারি সংস্থার মুনাফা আর্থিক বৃদ্ধিহারের এক প্রধান চালিকাশক্তি ও কর্মসংস্থানের অন্যতম পথ। যদিও তাঁর ভাষণের পর বিরোধীদের একটাই প্রশ্ন, নরেন্দ্র মোদি সব বললেন, শুধু এটা বললেন না যে, আমেরিকার কাছে তাঁর আত্মসমর্পণের কারণটা ঠিক কী?