• ‘DA দয়ার দান নয়’, জানাল সুপ্রিম কোর্ট
    এই সময় | ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • এই সময়, নয়াদিল্লি ও কলকাতা: মহার্ঘ ভাতা বা ডিএ কি রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের দয়ার দান? রাজ্য কি বকেয়া ডিএ দিতে বাধ্য?

    এ নিয়ে বিতর্ক শুরু হওয়ার ১০ বছর পরে অবশেষে রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের দাবিতেই সিলমোহর দিল সুপ্রিম কোর্ট। আদালতের স্পষ্ট নির্দেশ, পঞ্চম বেতন কমিশন অনুযায়ী ২০০৯–এপ্রিল থেকে ২০১৯–এর জুলাই পর্যন্ত বকেয়া ডিএ অবিলম্বে মিটিয়ে দিতে হবে রাজ্যকে। বাকি টাকা কী ভাবে, কত ভাগে দেওয়া হবে, তা দেখতে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে কমিটি গঠন করে দিয়েছে শীর্ষ আদালত। ডিএ ‘দয়ার দান’ নাকি কর্মচারীদের ন্যায্য অধিকারের মধ্যে পড়ে, তা নিয়ে এই ১০ বছরে স্টেট অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ট্রাইব্যুনাল (স্যাট) থেকে শুরু করে কলকাতা হাইকোর্টে বারবার বিতর্ক হয়েছে। কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ ২০২২–এই স্পষ্ট করে দেয়, ডিএ ‘দয়ার দান’ নয়। সুপ্রিম কোর্টে সর্বশেষ শুনানি পর্বে অবশ্য উভয় পক্ষ এ নিয়ে নতুন করে আর সওয়াল–জবাব করতে চায়নি। ফলে শীর্ষ আদালতও আলাদা করে এ নিয়ে কোনও সিদ্ধান্ত জানায়নি। ফলে ডিএ যে সরকারি কর্মীদের ‘দয়ার দান’ নয়, এটা ‘অধিকার’— হাইকোর্টের এই পর্যবেক্ষণই বহাল রইল।

    সুপ্রিম কোর্ট ‘দয়ার দান’ বিতর্কে আলাদা করে কোনও পর্যবেক্ষণ না–দিলেও, বিচারপতি সঞ্জয় কারোল ও বিচারপতি প্রশান্তকুমার মিশ্রের বেঞ্চ এ দিন ১২৪ পাতার দীর্ঘ রায় দিতে গিয়ে যে সব পর্যবেক্ষণ উ‍ল্লেখ করেছে, তাতে আইনজ্ঞদের বড় অংশই বলছেন, ডিএ যে সরকারি কর্মচারীদের অধিকার সেটাই বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছে আদালত। এত দিন ধরে কর্মীদের প্রাপ্য ডিএ না মেটানো রাজ্যের স্বেচ্ছাচারিতা কি না, বা কর্মচারীকে ন্যায্য প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করার অর্থ নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করা কি না, সে প্রশ্নও তুলেছে আদালত।

    বেঞ্চ মনে করিয়ে দিয়েছে, শুধুমাত্র আইন–শৃঙ্খলা রক্ষা বা বাজার ব্যবস্থা বজায় রাখা নয়, রাষ্ট্রের দায়িত্ব এমন পরিবেশ সৃষ্টি করা যেখানে সরকারি কর্মীরা নিরাপদে, মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাত্রা বজায় রাখতে পারেন। মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে যাতে কর্মচারীরা তাল মিলিয়ে জীবন–জীবিকা নির্বাহ করতে পারেন, তা নিশ্চিত করাও একটা সরকারের দায়িত্ব। সরকারের ভাঁড়ারে টাকা নেই বললেও তার জন্য কোনও ভাবেই তার কর্মচারীকে বঞ্চিত করা যায় না। এক্ষেত্রে বঞ্চনা হলে তা নাগরিকের মৌলিক অধিকার হরণের সমতুল্য বলেও পর্যবেক্ষণ বেঞ্চের। আদালতের বক্তব্য, এমন ভাবে কর্মচারীদের সঙ্গে বৈষম্য ও বঞ্চনা করা হলে তা সামাজিক সংহতির মূল ভিত্তিকেই আঘাত করে। কারণ, ডিএ কর্মীদের প্রতি কল্যাণকামী রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা ও সংবিধানের প্রতি তার দায়িত্ব সম্পর্কে ধারণা তৈরি করে। তবে আদালত মনে করিয়ে দিয়েছে, কর্মীদের বছরে দু’বার ডিএ পাওয়ার দাবির কোনও আইনি অধিকার নেই। এতদিন ধরে মামলা চলাকালীন প্রায় ১১ বছরের বকেয়া ডিএ–র উপরে সুদ মেটানোর যে দাবি ছিল কর্মীদের তরফে, তা–ও গ্রাহ্য করেনি আদালত।

    আদালতে পশ্চিমবঙ্গ সরকার দাবি করে, দেশের ১২টি রাজ্য কনজ়িউমার প্রাইস ইনডেক্স (এআইসিপিআই) মেনে ডিএ দেয় না। কিন্তু মামলার যাবতীয় নথি ঘেঁটে শীর্ষ আদালতের বক্তব্য, যারা মামলার অংশ নয়, তেমন রাজ্যের যুক্তি টেনে এনে রাজ্য নিজের দায় এড়াতে পারে না। বেঞ্চের বক্তব্য, যে সব রাজ্য বাজার দরের বাস্তব পরিস্থিতি অনুযায়ী নীতি তৈরি না করে শুধু ধারণার বশবর্তী হয়ে ডিএ দেওয়ার পক্ষপাতী, তাদের যুক্তিতে সায় নেই শীর্ষ আদালতের। এআইসিপিআই মেনে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ডিএ দেওয়া শুরু করেছিল। সেখানে হঠাৎ সেই পথ ছেড়ে কোনও যুক্তিসঙ্গত ভিত্তি ছাড়া ভিন্ন পথ নেওয়া ‘প্রকাশ্য স্বেচ্ছাচারিতা’র সামিল বলে মনে করে আদালত। যেহেতু সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ গোটা দেশের জন্যই প্রযোজ্য, তাই বাংলার সরকারি কর্মচারীদের ডিএ–রায়ের প্রভাব আগামী দিনে অন্য রাজ্যগুলিতেও পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আদালতের বক্তব্য, সংবিধান রাজ্যকে আর্থিক বিষয়ে যথেষ্ট স্বাধীনতা দিয়েছে। এবং সেই স্বাধীনতার ব্যবহার রাজ্য নিজেই করেছে। কেন্দ্রীয় সরকার কোনও শর্ত আরোপ করেনি। ফলে রাজ্য এখানে কেন্দ্রের সঙ্গে সংঘাতের যে অভিযোগ তুলেছে, তা কল্পনাপ্রসূত বলে মনে করে আদালত।

    শীর্ষ আদালতে রাজ্যের যুক্তি ছিল, বকেয়া ডিএ দিতে হলে সরকারের উপরে হাজার হাজার কোটি টাকার আর্থিক বোঝা বাড়বে। যার ফলে রাজ্যের অর্থনীতি ও আর্থিক নিরাপত্তার উপরে গুরুতর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। আদালতের পর্যবেক্ষণ, ‘এটা অযৌক্তিক। কারণ, একবার যখন কোনও আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়, সেক্ষেত্রে আর্থিক অক্ষমতা বা তহবিলের অভাবের অজুহাতে সেই অর্থ মেটানোর দায় অস্বীকার করা সরকারের পক্ষে গ্রহণযোগ্য নয়। একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের কাছে ন্যূনতম প্রত্যাশা হলো, আইন মেনে তার বাধ্যবাধকতা ও দায় যথাযথ ভাবে পালন করা। এই দায়–দায়িত্বগুলি ঐচ্ছিক নয়, তা বাধ্যতামূলক।’ কর্মচারীদের পাওনা সংক্রান্ত বিষয়ে রাজ্যের শূন্য ভাঁড়ারের যুক্তি ‘বিপজ্জনক’ ও ‘দমবন্ধকারী’ বলে পর্যবেক্ষণ সুপ্রিম কোর্টের।

    নাগরিকদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দেওয়া কল্যাণকামী রাষ্ট্রের কর্তব্য বলে মনে করে সুপ্রিম কোর্ট। আদালতের বক্তব্য, রাষ্ট্রের ভূমিকা কেবল আইন–শৃঙ্খলা রক্ষা করা বা বাজার ব্যবস্থাকে সহায়তা করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মুদ্রাস্ফীতির জন্য ক্রয়ক্ষমতা কমে গিয়ে যাতে বেতনভোগী ও নিম্ন আয়ের মানুষের উপরে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না হয় তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া সরকারের কাজ। এই আবহে মহার্ঘ ভাতা কল্যাণকামী রাষ্ট্রের হাতে একটি কার্যকর সুরক্ষামূলক হাতিয়ার বলে মনে করে আদালত।

    আদালতের রায়ে বিভিন্ন ভাবে উঠে এসেছে, রাষ্ট্রকে দেশের অন্যান্য নিয়োগকর্তাদের মতো একটি ‘আদর্শ নিয়োগকর্তা’ (model employer) হিসেবে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ, ‘রাষ্ট্রের যে সব সুবিধা রয়েছে— কর আরোপের ক্ষমতা, ঋণ নেওয়া ও সরকারি অর্থব্যবস্থাপনার সক্ষমতা— সেগুলো বিবেচনা করলে নিজেকে আদর্শ নিয়োগকর্তার জায়গায় নিয়ে যাওয়া রাষ্ট্রের পক্ষে কঠিন হওয়ার কথা নয়। আদর্শ নিয়োগকর্তা হিসেবে রাষ্ট্র তার আইনগত দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি আইনের শাসন, সুশাসন ও প্রশাসনের উপরে জনগণের আস্থা জাগিয়ে তুলতে পারে।’ আদালতের আরও বার্তা, ‘আর্থিক সংকটে নিজের দায়িত্ব পালন করলে রাষ্ট্র বেসরকারি সংস্থাগুলিকেও আইনি পথে চলতে বাধ্য করতে পারে।’

    কর্মচারীদের মহার্ঘ ভাতা প্রাপ্তি একটি আইনি অধিকার— এই প্রশ্নটির আগেই নিষ্পত্তি হয়ে গিয়েছে বলে মত আদালতের। তারপরেও ২০০৮ থেকে ২০১৯— অর্থাৎ প্রায় এগারো বছর, প্রত্যেক মাসে প্রাপ্য মহার্ঘ ভাতা না দেওয়া কর্মীদের প্রতি রাজ্যের ‘সংঘটিত অন্যায়’ বলে মনে করে আদালত। আদালতের যুক্তি, নিঃসন্দেহে কর্মচারীদের পারিশ্রমিক সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সরকারের আছে। কিন্তু একবার সেই ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরে আর সেখান থেকে সরতে পারে না সরকার।

    আদালতের বক্তব্য, কেবলমাত্র সময়ের বিলম্বতেই কোনও ন্যায্য দাবি সর্বদা বাতিল হয়ে যায় না। তবে যখন সেই বিলম্ব অযৌক্তিক, ব্যাখ্যাহীন এবং ন্যায়বিচারের পরিপন্থী হয়, তখন সেই দাবি নস্যাৎ হতে পারে। কিন্তু এক্ষেত্রে বকেয়া নিয়ে দীর্ঘ আইনি লড়াই চলেছে। কর্মীদের দাবিও জোরালো হয়েছে। তাই শুধু বিলম্বের কারণে তাদের দাবি খারিজ করা যায় না। আদালতের পর্যবেক্ষণ, ‘যখন ডিএ নিয়ে আইনগত প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তখন যথাযথ হারে মহার্ঘ ভাতা না দেওয়ার বিষয়টি অন্যায় হিসেবে কর্মচারীরা লাগাতার তুলে ধরছিলেন।’

  • Link to this news (এই সময়)