'লক্ষ্মীর ভাণ্ডার'। সার্চ ইঞ্জিনের ভাষায়, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির অন্যতম চর্চিত কিওয়ার্ড। এমন একটি কিওয়ার্ড, যা ২০২১ সালেও যতটা প্রাসঙ্গিক ছিল, ২০২৬ সালেও ততটাই প্রাসঙ্গিক। এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের অন্তর্বর্তী বাজেটে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার ৫০০ টাকা করে বাড়ানোর ঘোষণায় ২০২১ ও ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ন্যারেটিভ মিলিয়ে দিল। আবার বাজেটে ঘোষণার পরেই বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী দাবি করলেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে ৩ হাজার টাকা করে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার দেওয়া হবে। একাংশের মানুষ যতই দাবি করুন,ভাতার রাজনীতি চলছে, কিন্তু ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচন ও ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন,দুই ক্ষেত্রেই দেখা গিয়েছে, তৃণমূল কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গে ভাল ফল করেছে।
শুধুমাত্র ভাতার রাজনীতি বা ধর্মের রাজনীতি বলে চিত্কার করলে হবে না
পশ্চিমবঙ্গের ভোট রাজনীতি ২০২১ সাল থেকে একটি মোড় নিয়েছে। প্রথমটি, ভাতা বা অনুদান। আরেকটি হল ধর্ম। এবং এই দুই ট্রেন্ডকে শুধুমাত্র ভাতার রাজনীতি বা ধর্মের রাজনীতি বলে চিত্কার করলে হবে না। এটাও একধরনের রাজনীতি। bangla.aajtak.in-কে ফোনে বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক শুভময় মৈত্র বলেছিলেন, 'প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতার বাইরেও অনেক চলরাশি আছে। যেমন লক্ষ্মীর ভাণ্ডার একটি চলরাশি। দুর্নীতি একটি চলরাশি। তেমনই প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতাও একটি চলরাশি। যে কোনও ধর্ম বা ঈশ্বর সংক্রান্ত বিষয় যখন ঘটছে, তখন দুটি জিনিস হচ্ছে।'
২০২১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথমবার লক্ষ্মীর ভাণ্ডার ঘোষণা করেছিলেন। বুঝতে অসুবিধা হয় না, রাজ্যের মহিলা ভোটব্যাঙ্ককে টার্গেট করেই সেই প্রকল্প ঘোষণা করা হয়েছিল। তারও ফলও এসেছিল হাতেনাতে। ২০২১ সালের রেজাল্টে দেখা গেল, পশ্চিমবঙ্গের মহিলা ভোটাররা ঢালাও ভোট দিয়েছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসকে। পশ্চিমবঙ্গে মহিলা ভোটারের সংখ্যা ৩ কোটি ৭৬ লক্ষের কিছু বেশি। এর মধ্যে সব সম্প্রদায় ও জাতির মহিলারা রয়েছেন। এই ভোটব্যাঙ্কে ধর্মের বিভেদের ব্যাপার নেই।
২০১৯ সালে সেন্টার ফর স্টাডি অফ ডেভেলপিং সোসাইটিজ-এর একটি ভোট পরবর্তী সমীক্ষা অনুযায়ী, ভারতবর্ষের মধ্যে তৃণমূলই একমাত্র দল যা পুরুষদের চেয়ে মহিলাদের ভোট পায় বেশি। ২০১৬ সালের বিধানসভা ভোটে নাকি তৃণমূলের প্রাপ্ত ভোটের ৫২% ছিল মহিলা ভোট। পশ্চিমবঙ্গের ৪৮% মহিলা ভোটার তাঁদের ভোট দেন। বস্তুত, পশ্চিমবঙ্গে প্রায় অর্ধেক মহিলা ভোটব্যাঙ্ক। লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মতো প্রকল্প যা সরাসরি এই ভোটারদের প্রাভাবিত করে। পশ্চিমবঙ্গে মহিলা ভোট যে বড় ফ্যাক্টর, তা ক্ষমতায় এসেই বুঝে গিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। যার নির্যাস, ২০১৩ সালে কন্যাশ্রী প্রকল্পের ঘোষণা।
২০২১ সাল থেকে কীভাবে বেড়েছে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার?
২০২১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথমবার ঘোষণা করলেন, পশ্চিমবঙ্গের মহিলাদের ৫০০ টাকা করে প্রতিমাসে দেবে রাজ্য সরকার। হ্যাঁ, ওটা 'মাস্টার স্ট্রোক' ছিল। ওই ভোটে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি-র অনেকটা আসন বাড়লেও, প্রধান বিরোধী দলের তকমা পেলেও, তৃণমূল কংগ্রেসের আসনও বেড়ে গিয়েছিল। এরপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পে টাকাও বেড়েছে। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের টাকা আরও ৫০০ বাড়িয়ে দিলেন। এরপর ২০২৬ সালের বিধান সভা নির্বাচন। তার আগে ফের ৫০০ টাকা করে বেড়ে গেল এই প্রকল্পে। এবারের অন্তর্বর্তী বাজেটে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের ১৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ বাড়ানো হল। তার ফলে এবার থেকে সাধারণ বা জেনারেল মহিলারা পাবেন ১৫০০ টাকা। তফসিলি জাতি ও উপজাতিভুক্তরা পাবেন মাসিক ১৭০০ টাকা। চলতি মাসেই বাড়তি টাকা হাতে পাবেন মহিলারা।
বাংলার মৌন ভোটার কেন ফ্যাক্টর?
তাহলে কি BJP-র ভোট ন্যারেটিভে মহিলাদের মন জয় করা যাচ্ছে না? প্রশ্নটা উঠছে। ২০২১ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের একাধিক বড় নেতাকে দলে টেনেছিল বিজেপি। তাতে যে বিশেষ লাভ হয়নি, তার প্রমাণ, রেজাল্ট। এবারের নির্বাচনে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী ইস্যুতে সরব হয়েছে বিজেপি। এই ন্যারেটিভেও কি মহিলা ভোটে কোনও প্রভাব পড়বে? সন্দেহ আছে। কারণ, 'মৌন ভোটার'। হ্যাঁ, এই মৌন ভোটাররা বড় ফ্যাক্টর পশ্চিমবঙ্গে। চুপচাপ থেকে কোন চিহ্নে তাঁরা কোন চিহ্নে ভোট দিয়ে আসছেন, তা বোঝা ভীষণ মুশকিল। আর এই মৌন ভোটারদের মধ্যে মহিলাদের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি।