• ভোটের মুখে জঙ্গলমহলে শিল্পের জোয়ার, রঘুনাথপুরে ২৭ হাজার কোটি টাকার কর্মযজ্ঞ
    দৈনিক স্টেটসম্যান | ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • রাজ্য বাজেটে জানানো হয়েছে, আধুনিক ইস্পাত কারখানা স্থাপনের জন্য ইতিমধ্যেই সম্ভাব্য শিল্প সংস্থাগুলিকে তিন হাজার একরের বেশি জমি বরাদ্দ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে একাধিক সিমেন্ট কারখানা উৎপাদন শুরু করেছে এবং আরও কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিরোধীদের কটাক্ষের মুখে থাকা রঘুনাথপুর শিল্পায়ন নিয়ে এই ঘোষণাকে কার্যত পাল্টা বার্তা হিসেবেই দেখছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।

    পুরুলিয়াকে কেন্দ্র করে যে গ্রানাইট হাব তৈরির প্রক্রিয়া চলছে, বাজেটে তারও স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে। গ্রানাইট ব্লক নিলামের জন্য একাধিক এলাকা ইতিমধ্যেই বাছা হয়েছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্ল্যাকস্টোন ব্লকও। পাশাপাশি পুরুলিয়ার সাতটি প্রধান আকরিক ব্লক, যার মধ্যে রয়েছে বিরল খনিজ পদার্থ, কপার ও অ্যাপাটাইট চিহ্নিত করে নিলামের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। শিল্প মহলের মতে, ভারী শিল্পের পাশাপাশি খনিজ শিল্পকে জুড়ে দিয়ে পুরুলিয়ার অর্থনীতির ভিত আরও মজবুত করার চেষ্টা করছে রাজ্য।

    শুধু পুরুলিয়াই নয়, বাঁকুড়াতেও গড়ে উঠছে নতুন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প পার্ক। একই সঙ্গে পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনাকে সামনে রেখে জঙ্গলমহলের চার জেলা—পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম ও মেদিনীপুর শহরকে আধুনিক শহর হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও বাজেটে তুলে ধরা হয়েছে।

    রঘুনাথপুর শিল্পাঞ্চলের অতীত ইতিহাসও নতুন করে সামনে এসেছে এই ঘোষণার সঙ্গে। বাম আমলে রঘুনাথপুর শিল্পতালুক গড়ে ওঠার পর জয় বালাজি, আধুনিক ও শ্যাম স্টিলের মতো বৃহৎ শিল্প সংস্থাকে জমি দেওয়া হলেও শিল্পায়ন বাস্তবায়িত হয়নি। রাজ্যে পালাবদলের পর সেই জমি রাজ্যের হাতে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলি। এরপর রঘুনাথপুরকে ইন্ডাস্ট্রিয়াল হাব হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ২০১৬ সালে ‘জঙ্গলসুন্দরী কর্মনগরী’ ঘোষণার পরেই বিনিয়োগে নতুন করে গতি আসে।

    শ্যাম স্টিলকে প্রায় ৬০০ একর জমি দেওয়া হয়, যেখানে বর্তমানে উৎপাদনের কাজ চলছে। শাকম্ভরী পেয়েছে ৫৪৭ একর জমি। রশ্মি গ্রুপকে বরাদ্দ করা হয়েছে সবচেয়ে বেশি— প্রায় ৯৩৮ একর। নক্ষিত আয়রন অ্যান্ড স্টিলও জমি পেয়েছে এই কর্মনগরীতে। এর বাইরে অনুসারী শিল্প হিসেবে একাধিক সিমেন্ট কারখানা গড়ে উঠেছে, যা এই শিল্পাঞ্চলের অর্থনৈতিক গতিকে আরও বাড়িয়েছে।

    পুরুলিয়া জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, রশ্মি গ্রুপ তাদের ইন্টিগ্রেটেড ইস্পাত প্রকল্প ও ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে প্রায় ৫৬৫৩ কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে চলেছে। নক্ষিত আয়রন অ্যান্ড স্টিলের বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ১৪৪০ কোটি টাকা। শুধু রশ্মি গ্রুপের প্রকল্পেই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১৮ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

    খনিজ শিল্পেও ইতিমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে জেলার বিভিন্ন ব্লকে। বলরামপুরের বেলডিতে অ্যাপাটাইট খনি, মিরমিতে কোয়ার্টজ ও ফেলসপার প্রকল্প, হুড়ার বড় পানজানিয়া ও রঘুনাথপুর-১ ব্লকের পশ্চিম বেরোতে গ্রানাইট প্রকল্প, কাশীপুর ব্লকের পালসারাতে ব্ল্যাকস্টোন প্রকল্প— এই সব মিলিয়ে পুরুলিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় শিল্প সংক্রান্ত কর্মকান্ড চোখে পড়ছে।

    সব মিলিয়ে রাজ্য বাজেটে জঙ্গলমহলের শিল্প সম্ভাবনাকে যেভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তাতে পুরুলিয়ার মতো পিছিয়ে থাকা জেলায় কর্মসংস্থানের নতুন দরজা খুলবে বলেই আশা স্থানীয় মানুষজনের। শিল্পশহর রঘুনাথপুর থেকে শুরু করে জঙ্গলমহলের প্রত্যন্ত ব্লক— সর্বত্রই শিল্পায়নের এই গতি জেলার ভাগ্যকে আদৌ বদলে দেবে কি না, তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
  • Link to this news (দৈনিক স্টেটসম্যান)