এই সময়: বাজেট বিতর্কে মাদ্রাসা শিক্ষা ও সংখ্যালঘু উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ অর্থ নিয়ে শুক্রবার উত্তপ্ত হয়ে উঠল বিধানসভা। সংখ্যালঘুদের সম্পর্কে বিজেপি বিধায়ক অগ্নিমিত্রা পলের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে বিতর্ক তৈরি হয়। যার জবাবে ট্রেজ়ারি বেঞ্চ থেকে রাজ্যের মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম কড়া ভাষায় আক্রমণ করেন অগ্নিমিত্রাকে।
বিধানসভায় দাঁড়িয়ে একটি সম্প্রদায় সম্পর্কে এ রকম মন্তব্য করা যায় কি না, তা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন। স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় বিতর্কিত মন্তব্যগুলি বিধানসভার রেকর্ড থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেন। বিধানসভায় তিনি বলেন, ‘কোনও সম্প্রদায়কে আঘাত দিয়ে বিধানসভায় কোনও মন্তব্য করা যায় না। আমাদের সবাইকে এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।’
বিজেপি বিধায়কদের দাবি, চলতি বাজেটে সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও মাদ্রাসা শিক্ষার খাতে প্রায় ১০ শতাংশ বেশি অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। কিন্তু এই বরাদ্দ আদৌ শিক্ষার মানোন্নয়নে ব্যয় হবে কি না, তা নিয়ে এ দিন বিধানসভায় প্রশ্ন তোলেন অগ্নিমিত্রা। তাঁর বক্তব্যে ইঙ্গিত ছিল, মাদ্রাসা শিক্ষায় অর্থ বরাদ্দ বৃদ্ধির পিছনে রাজ্য সরকারের বিশেষ কোনও উদ্দেশ্য আছে। এই মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানান ফিরহাদ।
পরে বিধানসভার বাইরে অগ্নিমিত্রা বলেন, ‘আমি বলেছি, সংখ্যালঘু উন্নয়ন এবং মাদ্রাসা খাতে অনেক টাকা দেওয়া হয়েছে এ বারের বাজেটে। তৃণমূল সরকার সংখ্যালঘুদের ভোটব্যাঙ্কের জন্য ব্যবহার করে ক্রিমিনাল বানাচ্ছে।’ তাঁর প্রশ্ন, ‘এতে ফিরহাদ হাকিমের এত সমস্যা হলো কেন!’ বিধানসভায় নিজের ঘরে ফিরহাদ চাঁচাছোলা ভাষায় অগ্নিমিত্রাকে নিশানা করে সাংবাদিকদের বলেন, ‘একটি সম্প্রদায়কে ক্রিমিনাল আখ্যা দেওয়ার সাহস উনি কোথা থেকে পেলেন! ভারতীয় সংখ্যালঘুদের যা অধিকার, অগ্নিমিত্রা পলের একই অধিকার।’
তাঁর প্রশ্ন, ‘এপিজে আব্দুল কালাম ক্রিমিনাল? নজরুল ইসলাম ক্রিমিনাল? উনি জানেন, ভারতের স্বাধীনতার জন্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কত জন প্রাণ দিয়েছেন?’ বিধানসভার বাইরে এর জবাব দিতে গিয়ে অগ্নিমিত্রার বক্তব্য, ‘স্বাধীনতা সংগ্রামে সংখ্যালঘুদের কী অবদান, আমরা সবাই জানি। সুভাষচন্দ্র বসুর ডানহাত ছিলেন একজন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ। তৃণমূল সব কিছু গুলিয়ে দিতে চাইছে। কলকাতার মেয়র আমার একটা প্রশ্নের শুধু উত্তর দিন— গত ১৫ বছরে মাদ্রাসাগুলি থেকে কতজন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিজ্ঞানী হয়েছেন— তার রেকর্ড আমরা দেখতে চাই।’
তৃণমূলের অবশ্য দাবি, আসল ক্রিমিনাল বিজেপি। ফিরহাদের কথায়, ‘উনি (অগ্নিমিত্রা) সংখ্যালঘুদের ক্রিমিনাল বলার আগে নিজের দলের নেতাদের দিকে তাকিয়ে দেখুন। গুজরাট দাঙ্গার কথা মনে করার চেষ্টা করুন।’ বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী প্রত্যাশিত ভাবেই অগ্নিমিত্রার পাশে দাঁড়িয়ে বিধানসভার বাইরে বলেন, ‘চলতি বাজেটে মাদ্রাসা শিক্ষায় ৫,৭১৩ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। যেখানে শিল্পখাতে বরাদ্দ ১,৪০০ কোটি এবং তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে মাত্র ২১৭ কোটি টাকা। এত বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরেও মাদ্রাসা থেকে চিকিৎসক, ইঞ্জিনিয়ার বা আইনজীবী তৈরি হচ্ছে না কেন? এই প্রশ্নটা তোলাই অগ্নিমিত্রা পলের বক্তব্যের মূল উদ্দেশ্য।’
তৃণমূল অবশ্য এত সহজে ইস্যুটি হাতছাড়া করতে চাইছে না। দলীয় সূত্রে খবর, আজ, শনিবার বিধানসভা অধিবেশনের শেষ দিন অগ্নিমিত্রার বিরুদ্ধে আইনত কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হোক— এই মর্মে লিখিত আবেদন স্পিকারের কাছে জমা দিতে পারে তৃণমূল পরিষদীয় দল। এ দিনও স্পিকারের কাছে অগ্নিমিত্রার বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি, শুভেন্দু অধিকারী এবং দিনহাটার তৃণমূল বিধায়ক উদয়ন গুহ পরস্পরের বাবাকে টেনে এ দিন বিধানসভা অধিবেশনে দ্বন্দ্বে জড়ান। বিষয়টি শালীনতার সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ায় স্পিকার জানিয়ে দেন, বিধানসভার রেকর্ডে এই বক্তব্যগুলি রাখা হবে না। তবে বাবাকে নিয়ে দুই বিধায়কের বাগবিতণ্ডা বিধানসভায় নজিরবিহীন বলে রাজনৈতিক মহলের ব্যাখ্যা।