মার্কিন চাপেই নত মোদি সরকার, রাশিয়ার তেল কিনলে ফের ২৫ শতাংশ শুল্ক
বর্তমান | ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
সমৃদ্ধ দত্ত, নয়াদিল্লি: ভারত ও আমেরিকার মধ্যে চূড়ান্ত হওয়া বাণিজ্য চুক্তির বিস্তারিত শর্তাবলি কেন ঘোষণা করছে না মোদি সরকার? সংসদে এনিয়ে প্রবল বিক্ষোভ দেখিয়ে চলেছে বিরোধী দলগুলি। তাদের অভিযোগ, ভারত সরকার অজানা কারণে আমেরিকার কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। কারণ, যে শর্তাবলির কথা মার্কিন প্রশাসন ঘোষণা করেছে, সেখানে স্পষ্ট যে, ভারতের তুলনায় আমেরিকার আর্থিক মুনাফা হবে অনেক বেশি। এমনকি যে শর্ত মেনে নিয়ে নয়াদিল্লি চুক্তি করতে সম্মত হয়েছে, সেটির অনেকাংশ অসম্মানজনক।প্রধানতম তিন শর্ত হল— রাশিয়ার থেকে ভারত তেল কিনতে পারবে না, ভারত বাধ্য হবে পাঁচ বছরে ৫০ হাজার কোটি ডলারের মার্কিন পণ্য ক্রয় করতে এবং সর্বোপরি মার্কিন বহু পণ্যের শুল্ক শূন্য ধার্য হবে, যেখানে ভারতকে দিতে হবে ১৮ শতাংশ শুল্ক। শনিবার অবশেষে ভারত ও আমেরিকার যৌথ বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে। দেখা গেল, বিরোধীদের এই অভিযোগই কার্যত সত্য। আর প্রত্যাশিতভাবেই তৃণমূল তোপ দেগেছে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে। দলের সাংসদ মহুয়া মৈত্রের কটাক্ষ, ‘মোদিজি ভারতকে সারেন্ডারল্যান্ডে পরিণত করেছেন। রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করার কারণেই ভারতের উপর চাপানো ২৫ শতাংশ শুল্ক মাফ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ভারতের উপর নজরদারি চালাবে আমেরিকা। কোনো বেচাল দেখলেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পীযূষ গোয়েলের সরকারি পাওয়ারপয়েন্ট প্রেজেন্টেশন মোদিজির ছবি ছাড়া বিস্তারিত কোনো তথ্য দিচ্ছে না।’একই সুর কংগ্রেসের। রাহুল গান্ধীর দলের বক্তব্য, প্রধানমন্ত্রীর নাম এখন থেকে সারেন্ডার মোদি হওয়া উচিত। একসময় প্রধানমন্ত্রী হাউডি মোদি এবং নমস্তে ট্রাম্প নামক দুই ইভেন্টে ট্রাম্পকে নিজের ঘনিষ্ঠতম বন্ধু হিসাবে তকমা দিয়েছিলেন। আজ চুক্তির বয়ান থেকে স্পষ্ট ‘নমস্তে ট্রাম্প’ জিতে গিয়েছে। কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশ কটাক্ষ করে বলেছেন, ‘দোস্ত দোস্ত না রহা!’ কংগ্রেসের প্রতিবাদের কারণ কী? কংগ্রেসের দাবি, যতটা অসম্মানজনক শর্তের কথা ভাবা হয়েছিল, ভারত ও আমেরিকার যৌথ বিবৃতি অনুযায়ী তার থেকেও বেশি নত হয়েছে মোদি সরকার। কারণ চুক্তিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ভারত রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করবে। শুধু তাই নয়, ঘুরপথেও তেল কেনা হচ্ছে কি না, সেব্যাপারে নজরদারি করবে মার্কিন প্রশাসনের একাধিক দপ্তর। চুক্তির অন্যথা হলে ফের ২৫ শতাংশ শুল্ক জরিমানা হবে। জয়রাম রমেশের তোপ, ‘রীতিমতো হুমকি হুঁশিয়ারি দিয়ে বাণিজ্য চুক্তি করিয়ে নিয়েছে আমেরিকা। চুক্তির একটি অংশে বলা হয়েছে ভারত পাঁচ বছরে ৫০ হাজার কোটি ডলারের পণ্য ক্রয় করবে আমেরিকা থেকে। অর্থাৎ বছরে ১০ হাজার কোটি ডলার মূল্যের পণ্য। আর এখন আমেরিকার থেকে গড়ে ৪০০০ কোটি ডলারের পণ্য ক্রয় করে ভারত। দ্বিগুণের বেশি নিজেদের ব্যবসা বাড়িয়ে নিচ্ছেন ট্রাম্প। অথচ বিস্ময়কর হল, ভারত থেকে কী কী ক্রয় করতে বাধ্য আমেরিকা তার কোনও ইঙ্গিতই নেই। এদিন বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল রাশিয়ার থেকে তেল কেনা নিয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি। স্রেফ বলেছেন, ভারতের ১৪০ কোটি মানুষের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সরকারের অগ্রাধিকার। অতীতে সরকার বারংবার এই অবস্থান স্পষ্ট করেছে। যদিও বিরোধীদের অভিযোগ ও আশঙ্কাকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন শিল্প-বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল। এদিন তিনি বলেছেন, ‘কৃষকদের স্বার্থের সঙ্গে সামান্যতম আপস করা হয়নি একথা আমি জোর গলায় বলছি। চাল, ডাল, জেনেটিকালি মডিফায়েড শস্য, ফল, জোয়ার, বাজরা, মাছ কোনো ফসল অথবা পণ্যের অবাধ আমদানির পথ খুলে দেওয়া হয়নি। বরং, আমি আজ ঘোষণা করছি যে, ভারতের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, কৃষি, শিল্পোৎপাদন সব আমূল বদলে যেতে চলেছে। ভারতীয় বহু পণ্যের জন্য জিরো ট্যারিফ রয়েছে।’ গোয়েলকে প্রশ্ন করা হয়, রাশিয়া থেকে ভারত তেল কিনতে পারবে না এই শর্ত কি মেনে নেওয়া হয়েছে? মন্ত্রী বলেন, ‘সেটা বিদেশমন্ত্রক বলতে পারবে!’