ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুনানিতে দাঁড়িয়ে ছোট দোকানদার, দিনমজুর, অস্থায়ী শ্রমিকদের রুটিরুজির বিপুল ক্ষতি তো আছেই। এর সঙ্গে তিন মাসেরও বেশি চলতে থাকা বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ায় (এসআইআর) ধাক্কা খেয়েছে স্কুল শিক্ষা ব্যবস্থা। কোভিড পরিস্থিতির মতো সরাসরি স্কুলে হয়তো তালা ঝুলছে না। কিন্তু রাজ্যে প্রান্তিক এলাকার স্কুলে মিড-ডে মিল বিতরণটুকু ছাড়া পড়াশোনা শিকেয় উঠেছে বলে একটি অনুসন্ধানেউঠে এসেছে।
ইদানীং কথায় কথায় স্কুল ছুটির জন্য প্রসিদ্ধ হয়ে ওঠা পশ্চিমবঙ্গে, এসআইআর প্রক্রিয়ায় ৮০,৬৮১ জন বিএলও নিয়োগ করা হয়েছে। তাঁদের শতকরা ৮০ ভাগ স্কুল শিক্ষক ধরলেও সংখ্যাটা ৬৪,৫৪৫ জন। কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকের সংযুক্ত জেলাভিত্তিক তথ্য ব্যবস্থা বা ইউনাইটেড ডিস্ট্রিক্ট ইনফর্মেশন সিস্টেম (ইউডাইস) অনুযায়ী, রাজ্যে স্কুলের ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত হল ২৭:১। তা হলে শিক্ষকদের মধ্যে ৬৪,৫৪৫ জন বিএলও নিয়োগ হলেও সরকারি স্কুলের অন্তত ১৭ লক্ষ ৪২ হাজার ৭১০ জন শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত। এই হিসেব ধরেই ইউডাইসের নথি অনুযায়ী, রাজ্যে প্রতি ন’জনের এক জন স্কুল শিক্ষার্থী মুশকিলে পড়ছে।
সামাজিক ন্যায় সংক্রান্ত গবেষণার একটি সংস্থা সবর ইনস্টিটিউটের তরফে মেলে ধরা এই ছবিটি মেনে নিচ্ছেন সমাজবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদেরা অনেকেই। গত ৪ নভেম্বর থেকে বিএলও-দের কাজ শুরু হয়েছে। সংস্থাটির তরফে সাবির আহমেদ, অশীন চক্রবর্তীরা দেখিয়েছেন, এক-এক জন শিক্ষক রোজ তিন ঘণ্টা করে পড়ান— এমন ধরে দু'মাস ক্লাস নষ্টের হিসেব করলে, ইতিমধ্যে স্কুলে ক্লাসের এক কোটি ১৬ লক্ষ ঘণ্টা জলে গিয়েছে।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক অনির্বাণ মুখোপাধ্যায় বলছেন, ‘‘এসআইআরের কাজে সব রাজ্যেই স্কুল শিক্ষকদের কাজে লাগানো হয়েছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গেই শিক্ষার্থীদের সরকারি স্কুল নির্ভরতা বেশি।’’ ইউডাইসের তথ্য বলছে, পশ্চিমবঙ্গে ৮৭.৭% স্কুল পড়ুয়াই সরকারি স্কুলে যায়। বিভিন্ন স্কুল শিক্ষা সংগঠনের মতে, এ রাজ্যে গড় মেনে ছাত্র শিক্ষক অনুপাত ২৭:১ হলেও বাস্তবে শহর, গ্রামে স্কুলে স্কুলে এই অনুপাতের ভারসাম্যে ফারাক রয়েছে। এবিটিএ সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সুকুমার পাইন বলছেন, ‘‘কলকাতার কয়েকটি স্কুলে দরকারের বেশি মাস্টারমশাই থাকলেও, বাঁকুড়ার জঙ্গলমহলেই কোথাও কোথাও ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত ১৪০-১৫০-এরও বেশি।’’ আবার কলকাতার কাছেই দক্ষিণ ২৪ পরগনার একাধিক স্কুলে কোনও একটি বিষয়ের সবেধন নীলমণি শিক্ষকটি এসআইআর-কর্মকাণ্ডে যুক্ত। ফলে, সেই বিষয়টির ক্লাস কার্যত বন্ধ হয়ে গিয়েছে। বাটানগরের নুঙ্গি হাই স্কুলে ভূগোলের সাকুল্যে দু’জন, কমার্সের একমাত্র শিক্ষক কিংবা বিবিরহাটের হাওড়ি দীননাথ স্কুলের ইতিহাস, জীবন বিজ্ঞান, কর্মশিক্ষা, কম্পিউটারের একমাত্র শিক্ষককেও বিএলও-র কাজ করতে হচ্ছে।
সরকারি স্কুলের পড়ুয়াদের মধ্যে এ রাজ্যে পিছিয়ে থাকা শ্রেণির হতদরিদ্র ঘরের ছেলেমেয়েরাই দলে ভারী—মনে করাচ্ছেন সমাজবিজ্ঞানী তথা অর্থনীতিবিদ অচিন চক্রবর্তী। তাঁর কথায়, ‘‘গণতন্ত্র রক্ষার প্রক্রিয়ায় সব থেকে বেশি মূল্য গরিব, পিছিয়ে থাকা শ্রেণিকেই দিতে হচ্ছে। সম্ভবত সেই জন্যই এসআইআরের নামে হেনস্থা, অন্যায় নিয়ে সমাজের তথাকথিত উচ্চ কোটি ততটা সরব নয়।’’
গবেষক সংস্থাটির হিসেবে, এসআইআর সংক্রান্ত দেড় কোটি শুনানির নোটিসেও হতদরিদ্র পরিবারগুলিরই বেশি ভোগান্তি হয়েছে। পরিবার পিছু দু’জন বা চার জন শুনানিতে গেলে, রাজ্যে তিন থেকে ছ’কোটি শ্রম দিবস নষ্ট হচ্ছে। যাতায়াত, খাওয়া, নথি তৈরির খরচে এক-এক জনের ১০০-১৫০ টাকা খরচ হয়েছে। খুব রক্ষণশীল হিসেবে, পরিবার পিছু ১০০ দিনের কাজের ন্যূনতম মজুরি (২৬০ টাকা) বা রাজ্যের সাম্প্রতিক জিডিপি অনুযায়ী ব্যক্তি পিছু দৈনিক আয় ৫৬১ টাকার ভিত্তিতে ধরলেও, রাজ্যে অন্তত ২০০০ কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। অচিনের কথায়, “এটা তো সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার ক্ষতি। রাষ্ট্রের ভাবা উচিত, কী ভাবে এর ক্ষতিপূরণ দেবে?’’