এই সময়, হাওড়া: পূর্ব রেলের একাধিক দূরপাল্লার ট্রেনে সম্প্রতি এক অভিনব অথচ ভয়ঙ্কর সমস্যার মুখে পড়ছেন হাজার হাজার যাত্রী। কোনও জরুরি কারণ ছাড়াই চলন্ত ট্রেনে চেন টেনে দেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে আশঙ্কাজনক ভাবে। এর জেরে শুধু একটি ট্রেন নয়, ব্যাহত হচ্ছে পুরো রেলপথের সময়সূচি। যাত্রীদের ভোগান্তি যেমন বাড়ছে, তেমনই রেলের উপরও বাড়ছে চাপ। পরিস্থিতি সামাল দিতে এ বার কড়া পথে হাঁটছে পূর্ব রেল।
পূর্ব রেলের হাওড়া ডিভিশনের ডিআরএম বিশাল কাপুর জানিয়েছেন, বিশেষ করে হাওড়া–বর্ধমান শাখায় এই প্রবণতা মারাত্মক আকার নিয়েছে। তাঁর কথায়, ‘সম্প্রতি লক্ষ করা যাচ্ছে, কিছু দায়িত্বজ্ঞানহীন যাত্রী কোনও প্রকৃত জরুরি কারণ ছাড়াই চলন্ত ট্রেনে চেন টানছেন। এতে ট্রেন হঠাৎ থেমে যাচ্ছে, গতি কমে যাচ্ছে এবং তার প্রভাব পড়ছে গোটা রেল চলাচলের উপরে।
একটি দূরপাল্লার ট্রেনে সাধারণত ১৫০০ থেকে ২০০০ যাত্রী থাকেন। একটি চেন টানার ঘটনা সেই সব যাত্রীকে বিপাকে ফেলে। শুধু তাই নয়, একটি ট্রেন থেমে গেলে, তার পিছনে থাকা একাধিক ট্রেনকেও সিগন্যাল অনুযায়ী থামতে হয় বা গতি কমাতে হয়। এর ফলে, ডমিনো এফেক্টের মতো, পুরো লাইনের সময়সূচি ভেঙে পড়ে। রেলের তথ্য অনুযায়ী, হাওড়া–বর্ধমান লাইনে প্রতি দিন গড়ে চার–পাঁচটি চেন টানার ঘটনা ঘটছে। অর্থাৎ, মাসে প্রায় ১৫০ বার এই ঘটনা ঘটছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, যাত্রীরা দেরিতে স্টেশনে পৌঁছে বন্ধু বা পরিচিতদের দিয়ে চলন্ত ট্রেনে চেন টানিয়ে ট্রেন থামানোর চেষ্টা করছেন।
এই প্রবণতাকে ‘রেল ব্যবস্থার প্রতি চরম অবহেলা’ বলেই ব্যাখ্যা করছেন রেল আধিকারিকরা।এই পরিস্থিতিতে রেল কর্তৃপক্ষ কড়া আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ডিআরএম বিশাল কাপুর জানিয়েছেন, কোনও গুরুত্বপূর্ণ বা বৈধ কারণ ছাড়া চেন টানলে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর মধ্যে রয়েছে জরিমানা, জেল এবং পরিচয় প্রকাশ করে সামাজিক মাধ্যমে ছবি দেওয়ার মতো কঠোর পদক্ষেপ। তাঁর কথায়, ‘এটা কোনও দুষ্টুমি নয়, এটা একটি অপরাধ। হাজার হাজার মানুষের যাত্রা বিঘ্নিত করা কোনও ভাবেই বরদাস্ত করা হবে না।’ একই সঙ্গে যাত্রীদের সচেতন করতে মাঠে নেমেছে রেল সুরক্ষা বাহিনী (আরপিএফ)। প্ল্যাটফর্মে এবং ট্রেন ছাড়ার আগে মাইকে ঘোষণা করে যাত্রীদের সতর্ক করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, কোনও বিপদ, অগ্নিকাণ্ড, গুরুতর অসুস্থতা বা প্রাণঘাতী পরিস্থিতি ছাড়া চেন টানা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। রেল কর্তৃপক্ষ আরও চাইছে, যাত্রীরা অন্তত ট্রেন ছাড়ার ৩০ মিনিট আগে স্টেশনে পৌঁছন। এতে তাড়াহুড়ো কমবে এবং বন্ধু বা আত্মীয়দের দিয়ে চেন টানানোর মতো বেআইনি কাজের প্রবণতাও কমবে বলে মনে করছে রেল।
এই উদ্যোগে সাধারণ যাত্রীরাও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন। বহু যাত্রীর বক্তব্য, একজনের দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজের জন্য হাজার হাজার মানুষ কেন ভুগবেন? জরুরি কারণ ছাড়া চেন টানা বন্ধ হওয়া উচিত। কেউ কেউ বলছেন, সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছতে না পারায়, বহু বার অফিস, পরীক্ষা বা গুরুত্বপূর্ণ কাজের ক্ষতি হয়েছে। রেল বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক সিগন্যালিং ও হাই-ডেনসিটি রেলপথে একটি ট্রেন হঠাৎ থেমে যাওয়া, নিরাপত্তায় বড়সড় ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। তাই এই অভ্যেস শুধু যাত্রী ভোগান্তি নয়, রেল নিরাপত্তার পক্ষেও মারাত্মক। সব মিলিয়ে, পূর্ব রেলের এই কঠোর পদক্ষেপকে স্বাগত জানাচ্ছেন যাত্রী থেকে শুরু করে রেলকর্মী সবাই। এখন দেখার বিষয়, শাস্তি ও সচেতনতার যুগলবন্দিতে এই ‘চেন টানা সংস্কৃতি’ কতটা নিয়ন্ত্রণে আসে। কারণ, শৃঙ্খলা ফিরলে তবেই দূরপাল্লার রেলযাত্রা হতে পারে আরও নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য ও সময়নিষ্ঠ।