• সুপ্রিম শুনানিতে কমিশনের 'সফটওয়্যার সীমাবদ্ধতা'
    আজকাল | ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • আজকাল ওয়েবডেস্ক: গত বুধবার ইতিহাস তৈরি করেছিলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। সুপ্রিম কোর্টে সওয়াল করেছিলেন তিনি। মমতা ব্যানার্জির করা মামলার পরবর্তী শুনানি ছিল সোমবার। নজর ছিল দেশের শীর্ষ আদালতের দিকে। এদিন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী নিজে শীর্ষ আদালতে উপস্থিত না থাকলেও, জোর সওয়াল করেন তাঁর আইনজীবীরা। একইসঙ্গে এদিন শুনানিতে শীর্ষ আদালত জানিয়ে দিয়েছে কোনওভাবেই বিঘ্নিত করা যাবে না এসআইআর প্রক্রিয়া। অন্যদিকে বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি কমিশনের  প্রতি কড়া মন্তব্য করেন সফটওয়্যার ইস্যুতে। এদিন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত মন্তব্য করেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর সুপ্রিম কোর্টে সওয়াল প্রসঙ্গেও। তিনি বলেন, 'এতে অস্বাভাবিক কী আছে, এটাই তো সংবিধানের প্রতি আস্থা, বিশ্বাসের প্রকাশ। এই বিষয়টিকে রাজনীতিকরণ করবেন না।' 

    সুপ্রিম শুনানিতে আইনজীবী শ্যাম দিওয়ান অভিযোগ করেন, গণহারে নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টা করছে কমিশন।  নিজের অভিযোগের প্রেক্ষিতে দিওয়ানের যুক্তি ছিল, 'নাম না মেলার কারণে কাউকেই বাদ দেওয়া যায় না। কিন্তু সাধারণ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—আধার বা তথাকথিত ফ্যামিলি রেজিস্টার ছাড়া অন্য নথি সন্দেহজনক ধরে বাতিল করতে।' তাঁর দাবি, ২৩ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশনের একটি পাওয়ারপয়েন্ট প্রেজেন্টেশন হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো হয়, যেখানে মাইক্রো অবজারভারদের কার্যত অতিরিক্ত নির্বাচন কর্তৃপক্ষের ভূমিকা দেওয়া হয়েছে।

    এর পরেই তিনি বলেন, 'এতে মনে হচ্ছে একটি গণহারে ভোটার বাদ দেওয়ার পরিকল্পনা চলছে।' তাঁর আশঙ্কা, ১৪ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ হয়ে গেলে এবং নির্বাচন বিজ্ঞপ্তি জারি হলে বিষয়টি ফেইট অ্যাকমপ্লি হয়ে যাবে। এদিন তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, গণহারে যেন ভোটারদের বাদ না দেওয়া হয়। 

    জোর সওয়াল করেন আইনজীবী কল্যাণ ব্যানার্জি। এদিন শীর্ষ আদালতে তিনি অভিযোগ করেন, 'হাজার হাজার আপত্তি একসঙ্গে জমা পড়ছে, অনেক ক্ষেত্রেই আপত্তিকারীর পরিচয় নেই। শুনানির সময় তাঁরা হাজিরও থাকছেন না। একজন ব্যক্তি শত শত আপত্তি দাখিল করছেন।'

    অভিষেক মনু সিংভি বলেন, '৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রাজ্য ৮০ হাজার BLO ও ৮ হাজারের বেশি ERO দিয়েছে, যাঁরা প্রশিক্ষিত গ্রুপ-বি অফিসার। অথচ বাইরের রাজ্য থেকে এমন কর্মীদের আনা হয়েছে যাদের বাংলা ভাষা বা প্রশাসনিক বাস্তবতা সম্পর্কে কোনও ধারণা নেই।' যদিও তাতে অসুবিধের কিছু নেই বলেই মত সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীর।

    শুনানিতে, সময় যত এগিয়েছে এদিন, কোর্টরুমে যেন পারদ চরেছে ততই। একদিকে মুখ্যমন্ত্রীর আইনজীবীদের সওয়াল, অন্যদিকে কমিশনের আইনজীবীদের প্রশ্ন। এদিন শুনানিতে বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি নির্বাচন কমিশনের সফটওয়্যার ব্যবস্থাপনা নিয়ে কড়া মন্তব্য করেন। যেকথা আগেও বারবার বাংলার মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, এদিন বিচারপতি বাগচির বক্তব্যে একই কথা। বাংলায় নামের পদবী, মধ্যনামের বিষয়টি উঠে আসে শুনানিতে। এদিন তিনি বলেন, 'সফটওয়্যার বাস্তব সমাজব্যবস্থাকে ধরতে পারছে না। বাংলায় ‘কুমার’ মধ্যনাম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ‘তপন কুমার রায়’ ও ‘তপন রায়’—এই কারণেই নোটিস পাঠানো হচ্ছে।” তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন—'একই অভিভাবকের পাঁচ-ছয় সন্তান থাকলেও নোটিস পাঠানো হচ্ছে, বয়সের ফারাক ৫০ বছর হলেই তা ‘সন্দেহজনক’ হতে পারে। কিন্তু আপনারা যে সফটঅয়্যার টুল ব্যবহার করছেন, তা অত্যন্ত কঠোর।'

    উল্লেখ্য, শুনানি শেষে এদিন শীর্ষ আদালত বেশকিছু অন্তবর্তী নির্দেশ জারি করেছে-

    ১. পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যে, আজ যে ৮,৫৫৫ জন গ্রুপ-বি অফিসারের তালিকা হস্তান্তর করা হয়েছে, তাঁরা সবাই আগামিকাল বিকেল ৫টার মধ্যে জেলা নির্বাচন আধিকারিক (DRO)-এর কাছে রিপোর্ট করবেন।

    ২. নির্বাচন কমিশন (ECI)-এর কাছে এই অধিকার থাকবে যে, প্রয়োজনে বিদ্যমান ERO ও AERO-দের পরিবর্তে নতুন অফিসার নিয়োগ করা যাবে অথবা যোগ্য বিবেচিত হলে বর্তমান অফিসারদের পরিষেবা ব্যবহার করা যাবে।

    ৩. রাজ্য সরকারের এই অফিসারদের সংক্ষিপ্তভাবে বায়োডাটা যাচাই করার পর, প্রয়োজনে এক বা দুই দিনের সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে, যাতে তাঁরা মাইক্রো অবজার্ভার হিসেবে কাজ করতে পারেন।

    ৪. মাইক্রো অবজারভার বা রাজ্য সরকারের এই অফিসারদের দায়িত্ব হবে শুধুমাত্র ERO-দের সহায়তা করা। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে ERO-র হাতেই থাকবে।

    ৫. যেহেতু নতুন করে সরকারি অফিসারদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের জমা দেওয়া নথি যাচাই করতে অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে। সেই কারণে, কিছু আবেদনকারীর প্রস্তাব অনুযায়ী, আদালত নির্দেশ দিচ্ছে যে ১৪ ফেব্রুয়ারির সময়সীমার পর আরও এক সপ্তাহ সময় ERO-দের দেওয়া হবে, যাতে তাঁরা নথি যাচাই সম্পন্ন করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

    সূত্রের খবর, এদিনের শুনানিতে বিচারপতি রাজ্য পুলিশের ডিজিপি'কে শো-কজ করেছেন। কারণ হিসেবে জানা গিয়েছে, কমিশনের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের আধিকারিকরা অভিযোগ জানানোর পরেও আপত্তিপত্র (ফর্ম সংক্রান্ত কাগজ) পোড়ানোর ঘটনায় কোনও FIR দায়ের করা হয়নি।এর বিরোধিতা করে সিনিয়র অ্যাডভোকেট গুরুস্বামী তীব্র আপত্তি জানান।সূত্রের  খবর, এই প্রসঙ্গেই প্রধান বিচারপতি বলেন, 'আমরা রাজ্যের ডিজিপিকে শোকজ করছি, যাতে তিনি ব্যক্তিগতভাবে একটি অ্যাফিডেভিট দাখিল করে ব্যাখ্যা দেন, নির্বাচন কমিশনের কাউন্টার অ্যাফিডেভিটে উত্থাপিত অভিযোগের পরেও তাঁর তরফে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। '
  • Link to this news (আজকাল)