• বিগ ব্রেকিং! শুরুতেই সব শেষ! কংগ্রেসের ঘোষণায় বামহীন 'একলা চলো', ভোটের আগেই ভাঙল জোট....
    ২৪ ঘন্টা | ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • অয়ন ঘোষাল: পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন (West Bengal Assembly Election 2026) ২০২৬-কে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতির সমীকরণ আমূল বদলে গেল। দীর্ঘদিনের ‘বাম-কংগ্রেস’ (Left-Cong alliance) জোটের জমানায় ইতি টেনে এবার একলা চলার পথে হাঁটল ভারতের জাতীয় কংগ্রেস। আগামী নির্বাচনে রাজ্যের ২৯৪টি আসনেই এককভাবে লড়াই করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে কংগ্রেস হাইকম্যান্ড। জানিয়েছেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার। 

    ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলার রাজনীতিতে বড়সড় রদবদল। দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর স্পষ্ট হয়ে গেল যে, আসন্ন নির্বাচনে বামেদের হাত ধরছে না কংগ্রেস। বরং রাজ্যের ২৯৪টি বিধানসভা আসনেই এককভাবে প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা। দিল্লিতে কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির (WBPCC) এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের পর এই সিদ্ধান্তে সিলমোহর দেওয়া হয়েছে।

    হাইকম্যান্ডের বৈঠক ও সিদ্ধান্তের নেপথ্যে

    সম্প্রতি নয়াদিল্লির ১০ রাজাজি মার্গে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে এবং লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর উপস্থিতিতে বাংলার কংগ্রেস নেতাদের একটি বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এআইসিসি-র পশ্চিমবঙ্গ ইনচার্জ গুলাম আহমেদ মীর এবং প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকারসহ অন্যান্য শীর্ষ নেতারা।

    বৈঠক শেষে গুলাম আহমেদ মীর সাফ জানিয়ে দেন, "তৃণমূল বা বাম—কারও সঙ্গেই জোট নয়। কংগ্রেস এবার বাংলায় নিজের শক্তিতে লড়বে।" রাহুল গান্ধীর উপস্থিতিতে নেওয়া এই সিদ্ধান্তে স্পষ্ট যে, নিচুতলার কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করতেই এই ‘একলা চলো’ নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। নেতৃত্বের মতে, বারবার জোট করে লড়াই করায় কংগ্রেসের নিজস্ব ভোটব্যাংক ও সাংগঠনিক শক্তি খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যাচ্ছিল।

    ব্যর্থ জোটের ইতিহাস ও বর্তমান কৌশল

    ২০১৬ সাল থেকে ‘শিলিগুড়ি মডেল’-কে সামনে রেখে বাম-কংগ্রেস জোটবদ্ধভাবে লড়াই শুরু করেছিল। ২০১৬-তে তারা প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে উঠে এলেও ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে জোটের ফল ছিল শোচনীয়। সংযুক্ত মোর্চা হিসেবে লড়াই করে কংগ্রেস ও বামেরা একটিও আসন পায়নি। এমনকি ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনেও বামেরা শূন্য হাতে ফেরে এবং কংগ্রেস মাত্র একটি আসন (মালদহ দক্ষিণ) ধরে রাখতে সক্ষম হয়।

    রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মানুষ বিজেপি-কে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে বেছে নেওয়ায় জোট অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছিল। বর্তমান প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই সংগঠনকে শক্তিশালী করার ওপর জোর দিচ্ছেন। তাঁর কথায়, "আগে নিজেকে শক্তিশালী হতে হবে। ২৯৪টি আসনে লড়াই করার মতো জায়গায় পৌঁছালে তবেই অন্য কেউ পাশে এসে দাঁড়াবে।"

    বামেদের প্রতিক্রিয়া ও অন্তর্কন্দল

    কংগ্রেসের এই সিদ্ধান্তে বাম শিবিরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সিপিআইএম নেতা সুজন চক্রবর্তী বিষয়টিকে কটাক্ষ করে বলেছেন, 'দেরিতে হলেও কংগ্রেস একা লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এটা ভালো। দোনামনা মনোভাব নিয়ে বিজেপি-তৃণমূলের বিরুদ্ধে লড়াই করা যায় না।' তবে তিনি এও মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, এই সিদ্ধান্তের দায়ভার কংগ্রেসকেই নিতে হবে।

    অন্যদিকে, বামফ্রন্টের অন্দরেও পরিস্থিতি খুব একটা সুখকর নয়। গত সপ্তাহে বামফ্রন্টের বৈঠকে ফরওয়ার্ড ব্লকের সঙ্গে সিপিএম নেতৃত্বের তীব্র বাকবিতণ্ডা হয়। ফরওয়ার্ড ব্লকের রাজ্য সম্পাদক নরেন চট্টোপাধ্যায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বৈঠক ত্যাগ করেন। আসন ভাগাভাগি নিয়ে শরিকি বিবাদ এবং কংগ্রেসের চলে যাওয়া—সব মিলিয়ে বাম শিবির এখন যথেষ্ট চাপে। সিপিএম রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম অবশ্য জানিয়েছেন, তাঁরা আর কংগ্রেসের জন্য অপেক্ষা করবেন না এবং আইএসএফ ও অন্যান্য শরিকদের নিয়ে বিকল্প পথ খুঁজবেন।

    তৃণমূল ও বিজেপি-র অবস্থান

    বাম-কংগ্রেস জোট ভেঙে যাওয়ায় শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস এবং প্রধান বিরোধী দল বিজেপি—উভয় পক্ষই টিপ্পনি কাটতে ছাড়েনি। তৃণমূলের দাবি, এই জোটের কোনও জনভিত্তি ছিল না বলেই বারবার মানুষ তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে। অন্যদিকে, বিজেপি মনে করে এই জোট আসলে তাদের ভোট কেটে তৃণমূলকে সুবিধা করে দেওয়ার একটি ‘কল’ বা যন্ত্র ছিল।

    পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ২০২৬-এর নির্বাচন এক অগ্নিপরীক্ষা। একদিকে তৃণমূলের ক্ষমতা ধরে রাখার লড়াই, অন্যদিকে বিজেপি-র জয়ের মরিয়া চেষ্টা। এই দ্বিমুখী লড়াইয়ের মাঝে কংগ্রেসের একা লড়ার সিদ্ধান্ত কি তাঁদের হৃত গৌরব ফিরিয়ে দেবে, নাকি ভোট কাটাকাটির রাজনীতিতে তারা আরও পিছিয়ে পড়বে? 

    প্রাক্তন প্রদেশ সভাপতি অধীর চৌধুরী জানিয়েছেন, হাইকম্যান্ডের নির্দেশ মেনেই তাঁরা একক লড়াইয়ের প্রস্তুতি নেবেন। এখন দেখার, SIR-এর পরবর্তী এই হাই-ভোল্টেজ নির্বাচনে বাংলার সাধারণ মানুষ কংগ্রেসের এই সাহসী পদক্ষেপকে কতটা সমর্থন জানায়।

     

  • Link to this news (২৪ ঘন্টা)