প্রতীক্ষা ঘোষ: ঋত্বিক ঘটকের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে কলকাতার এস আর এফ টি আই-এর (Satyajit Ray Film & Television Institute) প্রিভিউ থিয়েটর হলে, দ্য কলকাতা পার্টিশন মিউজিয়াম (KPM) ট্রাস্টের তত্ত্বাবধানে আয়োজিত হল একটি বিশেষ স্মরণানুষ্ঠানের।
দু’টি পর্বে বিভক্ত এই অনুষ্ঠানে, উঠে এল ঋত্বিক ঘটকের চলচ্চিত্র ভাবনা, শিল্পীসত্তা এবং তাঁর প্রাসঙ্গিকতা। এই স্মরণানুষ্ঠান নতুন করে ফিরে দেখার সুযোগ করে দিল ঋত্বিক ঘটকের চলচ্চিত্র, শিল্পীসত্তা ও সময় ছাপিয়ে থাকা প্রাসঙ্গিকতাকে।
প্রথম পর্বে বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট চলচ্চিত্র গবেষক, লেখক ও অধ্যাপক প্রফেসর সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে এক গভীর আক্ষেপ। ঋত্বিক ঘটকের মৃত্যুর সময় মাত্র গুটিকয়েক মানুষের উপস্থিতির কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, 'একজন এত বড় মাপের চলচ্চিত্র পরিচালকের মৃত্যু এমন নীরবতায় হবে—এ কথা মেনে নেওয়া তাঁর পক্ষে কঠিন। তাঁর মতে এই নীরব মৃত্যুর প্রধান কারণ মানুষ কখনও ঋত্বিক ঘটককে সম্পূর্ণভাবে বোঝার চেষ্টা করেনি। তাঁকে শুধুমাত্র দেশভাগের যন্ত্রণার মধ্যেই আটকে রাখা হয়েছে। চলচ্চিত্রে তাঁর সঙ্গীতের প্রয়োগ, সম্পাদনার ভাষা, কিংবা সামগ্রিক চলচ্চিত্র ভাবনা নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা খুব কমই হয়েছে। যেখানে জঁ লুক গদারকে নিয়ে সারা বিশ্বে এমন গুছিয়ে গবেষণা চলছে নিয়মিত, সেখানে আমাদের ঋত্বিক ঘটক আজও অবহেলিত।'
তবে অধ্যাপক আশাবাদী আগামী দিনে মানুষ বুঝতে শিখবে—'ঋত্বিককে শুধু দেশভাগ দিয়ে বেঁধে রাখা যায় না। মানুষ বুঝবে, কীভাবে তিনি দেশভাগের গণ্ডি ছাড়িয়ে আজও প্রাসঙ্গিক'
দ্বিতীয় পর্বে ঋতুপর্ণা রায়ের সঞ্চালনায় একটি প্যানেল ডিসকাশন আয়োজিত হয়। আলোচনায় অংশ নেন ক্রীড়া সাংবাদিক, অনুবাদক, লেখক ও গবেষক সাম্য দাসগুপ্ত এবং কবি ও লেখক মৈত্রেয়ী চৌধুরী। সাম্য দাসগুপ্ত তাঁর লেখা বইয়ের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ঋত্বিক ঘটক আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বর্তমান সময়ে এসআইআর-এর মতো ইস্যু নিয়ে কোনও চলচ্চিত্র নির্মিত হলেও, তা অনিবার্যভাবে ঋত্বিকের ভাবনার সঙ্গেই তাল মিলিয়ে চলবে।
অন্যদিকে মৈত্রেয়ী চৌধুরী ঋত্বিককে কবির চোখে দেখেন। তাঁর মতে, একজন শিল্পী হিসেবে ঋত্বিকের ‘খ্যাপামি’ তাঁকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করে। তিনি শিল্পীদের যন্ত্রণার কথা তুলে ধরে বলেন, বহু শিল্পীকে সীমিত শিল্পচর্চার পর আবার ন’টা পাঁচ’টার চাকরির জীবনে ফিরে যেতে হয়। প্রকৃত শিল্পচর্চার জন্য যে নির্ভীক উন্মাদনা প্রয়োজন, ঋত্বিক তা ধারণ করেছিলেন। দেশভাগের যন্ত্রণা যখন মানুষ পেছনে ফেলে আসতে চাইছিল, তখনও তিনি সেই যন্ত্রণাকেই চলচ্চিত্রে তুলে ধরেছিলেন। বর্তমানকে তথা আগামীর ইতিহাসকে ধরে রাখার এই তীব্র আকাঙ্খাই ওঁকে সবার থেকে আলাদ করে তুলেছে। এই ভয়হীন চিত্তই প্রকৃত শিল্প সৃষ্টির পথ দেখায় বলে তাঁর মত।