• ‘SIR’-পথে কোনও বাধা মেনে নেওয়া হবে না : সুপ্রিম কোর্ট
    এই সময় | ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • এই সময়, নয়াদিল্লি ও কলকাতা: ভোটার তালিকায় স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশনের (এসআইআর বা সার) পথে কোনও রকম বাধা মেনে নেওয়া হবে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিল সুপ্রিম কোর্ট। বাংলায় ‘সার’ সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে সোমবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি এনভি আনজারিয়ার বেঞ্চ দেশের সব রাজ্যকেই স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, ‘কোনও প্রয়োজনীয় নির্দেশ বা ক্ল্যারিফিকেশনের দরকার হলে আমরা দেবো। কিন্তু সার প্রক্রিয়ায় কোনও বাধা মেনে নেওয়া হবে না। এটা যেন সব রাজ্যের মাথায় থাকে।’ এ দিন শুনানির শেষে শীর্ষ আদালত যে নির্দেশ দিয়েছে, তাতে বাংলায় ‘সার’–এর চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ আরও পিছিয়ে যেতে চলেছে। কারণ, এ দিন বেঞ্চ জানিয়েছে, ভোটার তালিকা যাচাই পর্ব বা স্ক্রুটিনির মেয়াদ কমপক্ষে সাত দিন বাড়াতে হবে।

    ইতিমধ্যে বাংলায় ‘সার’–শুনানি প্রক্রিয়া ৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সম্পন্ন না–হওয়ায় হিয়ারিংয়ের মেয়াদ সাত দিন বাড়াতে চেয়ে কমিশনকে চিঠি দিয়েছেন রাজ্যের সিইও মনোজ আগরওয়াল। ফলে সেক্ষেত্রে শুনানি পর্বই চলবে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। তার পরে স্ক্রুটিনির জন্য আরও অন্তত সাত দিন দেওয়া হলে ২১ ফেব্রুয়ারি গড়িয়ে যাবে। তারপরে সিইও ও কমিশন স্তরে সেই তালিকা আবার স্ক্রুটিনি হবে। তাতেও আরও অন্তত সাত দিন লাগবে। অর্থাৎ, চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হবে তারও পরে। আগে ১৪ ফেব্রুয়ারি বাংলায় চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হওয়ার কথা ছিল। সামগ্রিক অবস্থা পর্যালোচনার জন্য এ দিনই দিল্লিতে কমিশনের সঙ্গে দেখা করার জন্য রওনা হয়ে গিয়েছেন সিইও মনোজ আগরওয়াল।

    বাংলার ‘সার’ প্রক্রিয়া নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশাপাশি আলাদা করে তৃণমূলের সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন ও দোলা সেন, কবি জয় গোস্বামীরা মামলা করেছেন সুপ্রিম কোর্টে। আবার মুখ্যমন্ত্রীর করা মামলাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে অন্য একটি মামলা করেছিল একটি সংগঠন। সিজেআই সূর্য কান্ত এ দিনের শুনানিতে এটাও জানিয়ে দেন, ‘(মুখ্যমন্ত্রীর মামলা) এতে অস্বাভাবিক কী আছে? এটাই তো সংবিধানের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতীক। এই বিষয়টিকে নিয়ে রাজনীতি করবেন না।’

    মুখ্যমন্ত্রীর মামলার প্রেক্ষিতে গত বুধবারের শুনানিতে শীর্ষ কোর্ট নির্দেশ দিয়েছিল, নির্বাচন কমিশনের চাহিদামতো গ্রুপ–বি অফিসার দিতে হবে রাজ্যকে। তা হলে মাইক্রো অবজ়ার্ভারদের জায়গায় তাঁরা কাজ করতে পারেন। কিন্তু সেই তালিকা রাজ্যের তরফে দেওয়া হয় ৭ ফেব্রুয়ারি দুপুর ১২টায়। এই বিষয়টি কমিশন এ দিন আদালতে জানালে দৃশ্যতই অসন্তোষ প্রকাশ করে বেঞ্চ। মুখ্যমন্ত্রীর তরফে আইনজীবী শ্যাম দিওয়া‍ন আদালতে বলেন, ‘আমরা রাজ্যের তরফে ৮,৫০৫ জন গ্রুপ–বি অফিসারের নামের তালিকা দিয়েছি কমিশনকে৷ ৭ ফেব্রুয়ারি ই–মেল করা হয়েছে৷ প্রত্যেকের নাম দেওয়া হয়েছে৷ জেলা ভিত্তিক নামের তালিকা দেওয়া হয়েছে৷’ কমিশনের কৌঁসুলি পাল্টা জানান, কোনও নাম দেওয়া হয়নি৷

    শুধুমাত্র বেলা ১২-৩০টায় জানানো হয়েছে, এত জন অফিসার দেওয়া হবে৷ এতেই অসন্তুষ্ট সিজেআই কান্ত বলেন, ‘এখানেই সমস্যা হচ্ছে৷ শুধু নম্বর দেওয়া হয়েছে, নামের তালিকা দেওয়া হয়নি!’ তাঁর সংযোজন, ‘৪ ফেব্রুয়ারি আমাদের সামনে বলা হয়েছিল, অফিসার দেওয়া হবে বলে৷ তারপরের দিন কেন দেওয়া হলো না? আজও নামের তালিকা দেওয়া হয়নি কেন? এদের প্রত্যেককে জেলা কালেক্টরেটে গিয়ে দায়িত্ব নিতে হবে৷ আপনারা আমাদের সামনে যা বলেছেন, তা করেননি কেন?’ দিওয়ান আশ্বাস দেন, তাঁরা এই নির্দেশ দ্রুত কার্যকর করবেন।

    সুপ্রিম–নির্দেশে আজ, মঙ্গলবার বিকেল ৫টার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তরফে দেওয়া রাজ্যের এই ৮,৫০৫ জন গ্রুপ–বি অফিসার জেলা কালেক্টরেটে রিপোর্টে করবেন৷ দু’–একদিন প্রশিক্ষণের পরে এই অফিসারদের কর্মদক্ষতা ও পারফরম্যান্স খতিয়ে দেখে তাঁদের কী ভাবে কাজে লাগানো হবে, তা স্থির করবে নির্বাচন কমিশন৷ আদালতের আরও নির্দেশ, কোনও ভোটারকে ‘সার’ সংক্রান্ত নোটিস পাঠানো হলে সেই ভোটারের নথি যাচাইয়ের ক্ষেত্রেও ইআরও-রাই শেষ কথা বলবেন, এখানেও মাইক্রো অবজ়ার্ভাররা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না৷ যে অফিসাররা সঠিক ভাবে দায়িত্ব পালন করবেন না, তাঁদের অপসারণ করতে পারবে নির্বাচন কমিশন, অন্তর্বর্তী রায়ে আরও জানিয়েছে বেঞ্চ।

    আগে জল্পনা থাকলেও এ দিনের শুনানিতে সুপ্রিম কোর্টে সশরীর উপস্থিত ছিলেন না তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ তাঁর হয়ে এ দিন দিওয়ান বারবার মাইক্রো অবজ়ার্ভারদের ভূমিকাকেই কাঠগড়ায় তোলেন৷ তাঁর যুক্তি, ‘আমরা মাইক্রো অবজ়ার্ভারদের ভূমিকা নিয়ে চিন্তিত৷ ভোটারদের নাম গণহারে বাদ দেওয়া হচ্ছে৷ অফিসারদের বদল করতে চাইলে আমরা বাধা দেবো না৷ তবে আমরা সুষ্ঠু ভাবে সমস্যার সমাধান চাইব৷’

    রাজ্য সরকারের তরফে বর্ষীয়ান আইনজীবী অভিষেক মনু সিঙ্ঘভি বলেন, ‘একটা ধারণা তৈরি করা হচ্ছে, যে আমরা অফিসারের নাম দিচ্ছি না৷ ৪ তারিখ পর্যন্ত ৮০,০০০ বিএলও দিয়েছি৷ ৮,৫২৪ এআরইও নিয়োগ করেছে কমিশন৷ ২৯৪ জন গ্রুপ–এ এইআরও নিয়োগ করা হয়েছে৷ এর পরেও কমিশন বাইরে থেকে ৮,৫০০ মাইক্রো অবজ়ার্ভার নিয়োগ করেছে৷ এঁদের সঙ্গে বাংলার সংস্কৃতির কোনও সম্পর্ক নেই৷’ তাঁর সংযোজন, ‘কমিশন কেন্দ্রীয় সরকারের অধিগৃহীত সংস্থা বা রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা থেকে লোক নিয়োগ করেছে৷ এঁরা ক্লার্ক, কাস্টমার অ্যাসিস্ট্যান্ট৷ আমরা বিডিও, ডেপুটি সেক্রেটারির মতো লোক দিয়েছি৷ আমাদের লোকদের গুণগত মান অনেক উন্নত৷’ কমিশনের আইনজীবী ফের অভিযোগ জানিয়ে বলেন, ‘রাজ্য সরকার সব গ্রুপ–বি অফিসার দেয়নি৷ আমরা ৫টি চিঠি লিখে এসডিও, এসডিএম পদমর্যাদার অফিসার চেয়েছিলাম৷ এঁরা মাত্র ৬৪ জন দিয়েছেন৷ বাকি অন্য লোক৷ বারবার বলা সত্ত্বেও যথাযথ অফিসার দেওয়া হচ্ছে না৷ এঁরা যে পুল দিচ্ছেন, সেখানে যোগ্য অফিসার দিতেই হবে৷’ তিনি জানান, মাইক্রো অবজ়ার্ভার হিসেবে যাঁদের নিয়োগ করা হচ্ছে, তাঁদের অন্তত ১০ দিনের প্রশিক্ষণ দরকার। এবং তাঁদের সেই প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। আর ১৪ লক্ষ লোকের শুনানি বাকি রয়েছে। রাজ্য যে অফিসারদের দেবে, তাঁদেরও এই কাজ করতে হলে প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

    মাইক্রো অবজ়ার্ভাররা সিদ্ধান্ত নিয়ে ভোটারদের নাম বাদ দিচ্ছেন, এমন একটি হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটের স্ক্রিন শট আদালতে পেশ করেন দিওয়ান৷ তাঁর যুক্তি, ‘আমরা চাই না, গণহারে লোকের নাম বাদ যাক৷ মাইক্রো অবজ়ার্ভারদের বলা হচ্ছে, তাঁরা ইআরও বা এইআরও-র সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত কি না, তা মার্ক করতে। শুধু তাই নয়, মাইক্রো অবজ়ার্ভারদের কথাতেই নাম বাদ দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মাইক্রো অবজ়ার্ভারদের এক ধরনের বেআইনি ভূমিকা দেওয়া হচ্ছে। ইআরও এবং এইআরও ঠিক বলার পরেও, মাইক্রো অবজ়ার্ভারকে কার্যত ট্রাম্প কার্ড দেওয়া হচ্ছে। এটা কোনও ভাবেই ঠিক নয়।’ এতে সিজেআই বলেন, ‘মাইক্রো অবজ়ার্ভাররা কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না৷ ইআরও-ই শেষ কথা বলবেন৷’

    কমিশনের ‘লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি’ ইস্যুতেও সফটওয়্যারের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিচারপতি বাগচী৷ তাঁর পর্যবেক্ষণ, ‘আপনাদের সফটওয়্যার খুবই সীমাবদ্ধ। অধিকাংশ বাঙালি পরিবারে মধ্যম নাম থাকে কুমার, তা নিয়েও নোটিস পাঠানো হয়েছে। এটা সম্পূর্ণ অনৈতিক পদক্ষেপ৷ আপনারা এমন লোকেদেরও নোটিস পাঠিয়েছেন, যাঁদের পাঁচ–ছ’জন সন্তান রয়েছে। ৫০ হলে ঠিক আছে! আপনারা যে সফটওয়্যার টুল ব্যবহার করছেন, তা অত্যন্ত কঠোর।’ উদাহরণ তুলে তাঁর পর্যবেক্ষণ, দাদু–নাতির মধ্যে বয়সের ব্যবধান নিয়ে যা বলা হয়েছে, তার সঙ্গে বাস্তবের মিল নেই।

    সুপ্রিম কোর্টের এ দিনের নির্দেশকে ‘গণতন্ত্রের জয়’ হিসেবে দেখছে রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল। দলের তরফে এক্স হ্যান্ডল পোস্টে বলা হয়েছে, ‘আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে, মাইক্রো অবজ়ার্ভাররা শুধুমাত্র ইআরও ও এইআরও–দের সহযোগিতা করতে পারেন, কিন্তু চূড়ান্ত ক্ষমতা ইআরও–দেরই। কমিশন যে ভাবে শুধুমাত্র বাংলায় মাইক্রো অবজ়ার্ভারদের প্যারাশুটে নামিয়েছে এখানকার সার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত ও ম্যানিপুলেট করতে, তা বড়সড় ধাক্কা খেলো।’ তৃণমূলের আরও বক্তব্য, ‘এটা গণতন্ত্রের পক্ষে বড় জয়। বাংলার পক্ষেও বড় জয়। এবং যারা মনে করে মানুষের বিরুদ্ধে এই ধরনের প্রতিষ্টানগুলিকে অস্ত্র করা যেতে পারে, তাদের এটা বিশাল পরাজয়। নাগরিকদের অধিকার, মর্যাদা ও নির্বাচনের পবিত্রতা রক্ষার লড়াই জারি থাকবে।’

  • Link to this news (এই সময়)