• ৩৮৯ জনের ‘বাবা’ একজন! ‘SIR’-এর নথিতে বিস্মিত EC–ও
    এই সময় | ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • সুগত বন্দ্যোপাধ্যায়

    বছর ৭৪–এর মঞ্জুরানি সাহার নাম রয়েছে উত্তর ২৪ পরগনার বারাসত বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটার তালিকায়। আবার বাংলাদেশের ঢাকা নারায়ণগঞ্জ পুরসভা এলাকার বাসিন্দা হিসেবে ও পারের ভোটার তালিকাতেও নাম রয়েছে তাঁর। পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকায় স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশনের (সার) খসড়া তালিকাতেও আবার তাঁর নাম উঠেছিল। একইসঙ্গে দু’দেশের ভোটার তালিকায় কী ভাবে তাঁর নাম ঠাঁই পেল? তা নিয়ে তৈরি হয়েছে রহস্য। ভোটার লিস্টের নথি ‘সুপার চেকিং’য়ের সময়ে মাইক্রো অবজ়ার্ভারের নজরে আসে এই নামটি। মঞ্জুরানি কোনও ব্যতিক্রম নন, বাংলায় ‘সার’–এর খসড়া তালিকায় এমন বেশ কিছু বাংলাদেশি নাগরিকের নাম ঠাঁই পেয়েছে বলে উঠে এসেছে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নজরে।

    পাশাপাশি ‘সন্দেহজনক’ তালিকায় থাকা আরও লাখ খানেক নাম এমন রয়েছে, যেখানে বাংলাদেশি যোগ উড়িয়ে দিচ্ছে না কমিশন। সূত্রের খবর, ‘লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি’র তালিকা খতিয়ে দেখতে গিয়ে এমনও নজির সামনে এসেছে যেখানে বীরভূমের নানুরে এক ব্যক্তিকে ৩৮৯ জন বাবা বলে পরিচয় দিয়েছিলেন ‘সার’–এর এনিউমারেশন ফর্মে। হাওড়ার সাঁকরাইলে আবার এক জন ‘বাবা’র ৩১০ জন ‘সন্তান’, মুর্শিদাবাদে এক জনের ১৯৯ জন এবং দার্জিলিংয়ে ১৫৫ জন ‘সন্তান’ দেখানো হয়েছে। এক ব্যক্তিকে ‘বাবা’ দেখানোর নিরিখে পিছিয়ে নেই জলপাইগুড়ির নাগরাকাটা (১২০ জন) এবং পশ্চিম বর্ধমানের আসানসোলও (১৭০ জন)।

    বাংলায় ‘সার’–এ এখনও পর্যন্ত ২০০ জনের ‘বাবা’ দেখানো হয়েছে অন্তত দু’জনকে, ১০০ জনের ‘বাবা’ সাত জন, অন্তত ১০ জনকে ‘বাবা’ বলে দেখিয়েছেন ৫০ জন বা তার বেশি ভোটার। ২ লক্ষ ৬ হাজারের বেশি মানুষ রয়েছেন যাঁদের ৬ জনের বেশি সন্তান রয়েছে। ৮,৬৮২ জন দেখিয়েছেন তাদের সন্তানের সংখ্যা ১০ জনের বেশি। এর মধ্যেও বাংলাদেশি নাগরিকরা জালিয়াতি করে নথি জমা দিয়েছেন কি না, তা খতিয়ে দেখছে কমিশন।

    রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (সিইও) দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রায় প্রতিদিনই ফরেনার রিজিওনাল রেজিস্ট্রেশন অফিস (এফআরআরও) এ রকম বাংলাদেশির নামের তালিকা পাঠাচ্ছে তাদের কাছে। মূলত যাঁরা বাংলাদেশি পাসপোর্ট–ভিসা নিয়ে ভারতে চিকিৎসা করাতে বা ব্যবসা বা পড়াশোনা বা অন্য কোনও কাজে ভারতে এসেছিলেন এবং তারপরে স্থানীয় কোনও দালালের মাধ্যমে ভারতীয় নথি তৈরি করে এ দেশের ভোটার তালিকায় নাম তুলেছেন— এমন ব্যক্তিদের নথি দিয়ে তাঁদের নাম এখানকার ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিতে বলেছে এফআরআরও।

    সূত্রের খবর, খসড়া তালিকা প্রকাশের পর থেকে দু’মাসেই অন্তত ২৭০০ এ রকম বাংলাদেশির নাম পাঠানো হয়েছে কমিশনের কাছে। এর মধ্যে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই এসেছে দু’শোর বেশি নাম। এর বাইরেও আরও বাংলাদেশির নাম ভারতীয় ভোটার তালিকায় রয়ে গিয়েছে বলে কমিশনের সন্দেহ। সিইও দপ্তর সূত্রের খবর, উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এই তালিকায় থাকা নদিয়ার চাপড়া ও হাঁসখালির বাসিন্দা মহম্মদ আজিরুল হক নিজেকে কাঞ্চন জমাদার এবং শাহিমুল আহমেদ নিজেকে শাহিমুল জমাদার হিসেবে পরিচয় দিয়ে ভারতীয় ভোটার তালিকায় নাম তুলেছেন। এঁদের নাম তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে কমিশনকে।

    সিইও দপ্তর সূত্র জানা গিয়েছে, এমন অনেক সন্দেহজনক ভোটারের নাম পাওয়া গিয়েছে, যাঁদের ‘সার’-এর এনিউমারেশন ফর্ম সংগ্রহের সময়ে মৃত, নিখোঁজ, স্থানান্তরিত অথবা ডুপ্লিকেট ভোটার হিসেবে বুথ লেভেল অফিসাররা (বিএলআর) চিহ্নিত করেছেন। তার বাইরেও বহু নাম পাওয়া গিয়েছে যাঁদের নথিতে সন্দেহ হওয়ায় ‘লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি’ হিসেবে চিহ্নিত করে নথি যাচাই চলছে। নথিতে সন্তুষ্ট না হলে সেই নামগুলিও বাদ দেওয়া হবে। পাশাপাশি ইআরও এবং এইআরও–দেরও সিইও দপ্তর সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, ‘সার’–এর চূড়ান্ত তালিকায় বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের নাম থাকলে শাস্তির মুখে পড়তে পারেন সংশ্লিষ্ট আধিকারিকরা। দায় এড়াতে পারবেন না বিএলআরও-রাও।

    অবশ্য ‘সার’–এর বেশ কয়েক মাস আগেই জঙ্গি সংগঠন ‘আনসারুল্লা বাংলা টিমে’র (এবিটি) এক সন্দেহভাজন জঙ্গি ধরা পড়ার পরে জানা যায়, সে বাংলাদেশি নাগরিক হলেও রাজ্যের দুই জেলায় দু’টি আলাদা বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটার তালিকায় তাদের নাম রয়েছে। তারপর থেকে ধারাবাহিক ভাবে এফআরআরও–র তরফ থেকে এই রকম বাংলাদেশি ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার জন্য ধাপে ধাপে তালিকা পাঠানোর কাজ চলছে।

  • Link to this news (এই সময়)