সত্যজিৎ রায়ের সেই হাড়হিম করা গল্পটা মনে আছে? ‘খগম’? যেখানে ইমলিবাবার অভিশাপে ধূর্জটিবাবু ধীরে ধীরে সাপ হয়ে গিয়েছিলেন? গল্পের শেষটা আজও বাঙালির মনে শিহরণ জাগায়। কিন্তু সেটা তো গল্প ছিল। সেই গল্পই যদি হঠাত বাস্তবে হানা দেয়? রক্তমাংসের মানুষ যদি রাতারাতি উধাও হয়ে যায়, আর তার শোয়ার বিছানায় পড়ে থাকে ৫ ফুট দীর্ঘ এক সাপের খোলস?
ঠিক এমনই ঘটেছে উত্তরপ্রদেশের আউরাইয়া জেলার এক গ্রামে। ঘটনাটি জানাজানি হতেই গোটা গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে তীব্র আতঙ্ক। মানুষের মুখে মুখে একটাই কথা— মেয়েটি কি তবে ইচ্ছা মতো রূপ বদলে ফেলা ‘নাগিন’? নাকি কারও অভিশাপের শিকার?
ঘটনার শুরুটা হয়েছিল এক সাধারণ শীতের সকালে। ওই সকালে স্বাভাবিক সময়ে ঘর থেকে বের হননি ওই যুবতী। এর পরে বাড়ির লোকজন তাঁকে ঘরের বাইরে থেকে ডাকাডাকি করেন। তাতেও সাড়া না পেয়ে দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকেছিলেন তাঁরা। আর তারপরেই তাদের চোখ কপালে উঠে গিয়েছিল।
তাঁরা বিছানায় তাঁদের মেয়ে নেই। কিন্তু খাটের উপরে পরে রয়েছে তাঁর জামাকাপড়। আর তার মধ্যে কুণ্ডলী পাকিয়ে পড়ে আছে প্রায় পাঁচ ফুট লম্বা একটি সাপের খোলস!
মুহূর্তে খবর ছড়িয়ে পড়ে দাবানলের মতো। গ্রামবাসীরা ছুটে আসেন। কেউ বলেন, ‘নিশ্চয়ই মেয়েটি নাগিন ছিল, নিজের রূপ ধরে চলে গিয়েছে।’ কেউ আবার ভয়ে সিঁটিয়ে গিয়ে বলেন, ‘এ নিশ্চিত কোনও প্রেতাত্মার কাজ।’ পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছয় যে, ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকা পরিবার পুলিশে খবর দিতে বাধ্য হয়।
ঘটনাস্থলে পুলিশ গিয়ে দেখে এক অদ্ভুত পরিস্থিতি। একদিকে গ্রামের মানুষের অন্ধবিশ্বাস আর আতঙ্ক, অন্যদিকে পরিবারের লোকজনদের অসংলগ্ন কথাবার্তা। পুলিশ অফিসাররা যখন সাপের খোলসটি পরীক্ষা করছিলেন, তখনও গ্রামের মোড়ে মোড়ে ফিসফাস— মেয়েটি সাপ হয়ে গিয়েছে।
পুলিশও প্রথমে ধন্দে পড়ে গিয়েছিল। তবে সাপের খোলসটি এত নিখুঁত ভাবে বিছানায় জামাকাপড়ের মধ্যে রাখা ছিল, যে অভিজ্ঞ তদন্তকারীদের মনে খটকা লাগে।
তদন্ত এগোতেই ‘খগম’-এর অলৌকিক জল্পনা ধূলিস্মাৎ হয়ে যায়। বেরিয়ে আসে এক চরম নাটকীয় সত্যি। যা কোনও সিনেমার চিত্রনাট্যের চেয়ে কম নয়।
না, ওই যুবতী সত্যি সত্যি সাপ হয়ে যাননি। তিনি মানুষই আছেন। আসলে গ্রামেরই এক যুবকের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে গোপনে প্রেমের সম্পর্ক ছিল তাঁর। ঠিক করেছিলেন পালিয়ে বিয়ে করবেন। কিন্তু বাড়ি থেকে পালানোর জন্য দরকার ছিল এক মোক্ষম পরিকল্পনার। যাতে বাড়ির লোক বা পুলিশ চট করে তাঁকে খুঁজতে না বের হয়।
তাই প্রেমিকের সঙ্গে পালানোর আগে তিনি নিজেই জোগাড় করেছিলেন ওই সাপের খোলস। আর সাজিয়ে রেখে গিয়েছিলেন এমন ভাবে, যাতে সকলেই ভাবে তিনি সাপ হয়ে গিয়েছেন।
পুলিশের স্টেশন ইন-চার্জ অজয় কুমার জানিয়েছেন, ‘এটি পুরোপুরি সিনেমার কায়দায় সাজানো এক নাটক। পালানোর আগে ওই যুবতী ইচ্ছাকৃত ভাবে সাপের খোলসটি বিছানায় রেখে যান। উদ্দেশ্য ছিল, বাড়ির লোক এবং গ্রামবাসীদের মনে কুসংস্কারের ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া। যাতে সবাই ভাবে কোনও অলৌকিক ঘটনা ঘটেছে এবং তাঁকে খোঁজার চেষ্টাও না করে।’
যুবতীর ‘সাপ’ হয়ে যাওয়ার গুজব পুলিশের তদন্তে উড়ে গেলেও ওই যুবতীর সন্ধান এখনও পাওয়া যায়নি। তাঁর এবং তাঁর প্রেমিক এখনও ফেরার। পুলিশ তাঁর মোবাইল ফোন ট্র্যাক করছে। বাড়ির লোক একটি নিখোঁজের অভিযোগ দায়ের করেছেন। গ্রামের মানুষের আতঙ্ক কেটেছে, তবে বিস্ময় কাটেনি। প্রেমের টানে মানুষ ঘর ছাড়ে, কিন্তু এমন ‘সাপুড়ে’ বুদ্ধি যে কারও মাথায় আসতে পারে, তা ভেবেই তাজ্জব সকলে!
সত্যজিৎ রায় বেঁচে থাকলে হয়তো এই ঘটনা শুনে মুচকি হাসতেন। বাস্তবে ‘খগম’ না থাকলেও, মানুষের কল্পনা যে কতটা বিচিত্র হতে পারে, এই ঘটনা তার জলজ্যান্ত প্রমাণ।