• অভিষেকের মতো সাংসদদের দিকেই তাকিয়ে আছে আগামীর ভারত
    আজকাল | ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • উদ্দালক

    একসময়ে সংসদে ভাষণ ও সংসদীয় রাজনীতির পুরোধা সাংসদদের নিয়ে আলোচিত হত। আলাদা করে কয়েকজনকে সাংসদ হিসাবে উদযাপন করত দেশ। মঙ্গলবার বাজেট অধিবেশনের আলোচনায় অভিষেক ব্যানার্জি বলতে শুরু করার পর তেমনই পূর্বসুরীদের কথা মনে পড়তে বাধ্য। কারণ, নতুন প্রজন্মের সাংসদ হিসাবে তিনি যে চাইছেন সংসদে নব্য রাজনীতির ঢেউ বইয়ে দিতে, সে কথা আজকের ভাষণে স্পষ্ট। আইপ্যাড থেকে চোখ তুলে তাই তিনি যখন পয়েন্ট তুলে-তুলে কেন্দ্রীয় সরকারকে আক্রমণ করছিলেন, প্রশ্ন করছিলেন, তখন তাঁকে দেখে মনে হচ্ছিল, এমনই হওয়া উচিত ভারতের নব্য গণতন্ত্রের প্রতিনিধিদের মুখ, ভাষা ও চেহারা। অভিষেক তেমনই। 

    তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক শুরুটাই করলেন একেবারে অন্যরকম করে। তিনি তুলে আনলেন কৌতুক শিল্পী বীর দাসের প্রসঙ্গ। বিদেশের অনুষ্ঠানে গিয়ে ভারতের সমালোচনা করে অতিভক্ত দেশপ্রেমিকদের রোষের মুখে পড়েছিলেন তিনি। সত্যি কথা বলে অকারণ আক্রান্ত হতে হয়েছিল তাঁকে। সেই বীর দাসের প্রসঙ্গ তুলে এনে প্রথমের 'পয়েন্ট অফ ডিসেন্ট' খুব স্পষ্ট করে দিলেন অভিষেক। তিনি বুঝিয়ে দিলেন আগাগোড়া তিনি লড়াইয়ের মানসিকতা নিয়েই এসেছেন। কথা ছিল তিনি সোমবার বলবেন, কিন্তু সেই ভাষণের দিন পাল্টে হয়েছে মঙ্গলবার। সকালে অখিলেশ যাদবের বলার পরেই তাই অভিষেক কী বলবেন, তা নিয়ে জল্পনা ছিল তুঙ্গে। কিন্তু কোনও গিমিকের পথে হাঁটেননি অভিষেক, বরং তিনি হেঁটেছেন যুক্তির পথে। 

    তিনি বীর দাশকে প্রসঙ্গ করে বলেছেন দুই ভারতের গল্প। এমন এক ভারতের কথা তিনি বলতে চেয়েছেন, যে ভারত আক্রান্ত, যেখানে বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের কোনও নজর পড়ছে না। কিন্তু কী ভাবে বলেছেন সে কথা, বলেছেন, যুক্তি পরম্পরা বজায় রেখে, নির্দিষ্ট পথে। আসলে এই প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা কোনও সংসদ দেখতে চায়, সেই সংসদ যেখানে আলোচনার নামে শুধুই চেঁচামেচি হয়, একে অপরের বিরুদ্ধে কুৎসা বর্ষণ হয়, একে অপরের কথাই শোনা যায় না, নাকি এমন এক সংসদ যেখানে শাসক-বিরোধী, উভয় পক্ষের মধ্যেই আলোচনা হয়। অবশ্যই দ্বিতীয়টি। এই প্রজন্ম চায় এমন সংসদ যেখানে আলোচনা হবে, সরকার যেমন বলবে, তেমনই বিরোধীদেরও বলার সুযোগ দেওয়া হবে। অকারণ, নিজেদের মধ্যে তরজা করে পরিস্থিতি এমন স্থান যাতে না পৌঁছয় যেখানে কোনও গঠনমূলক আলোচনাই সম্ভব নয়। অভিষেক তার উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে যেন উদাহরণ।

    আধুনিক সাংসদ কেমন হবেন, অভিষেক যেন তাঁর উদাহরণ, স্মার্টনেসের চূড়ান্ত নির্দশন। এলেমেলো কথা নয়, তাঁর তথ্য নির্ভর ও যুক্তি নির্ভর বক্তব্য তাই এই প্রজন্মের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে বাধ্য। শুধু এই প্রজন্ম কেন, সংসদে অনেকেই অভিষেকের থেকে বেশি বয়সের মানুষ। তাঁরাও এই ভাষণের সময় মোটে কথা বলেননি, বিরোধীদের তো নয়ই, এমনকী শাসক দলের বেশিরভাগ চুপ করে ভাষণ শুনেছে। আর এমনটাই আদর্শ গণতন্ত্রে হওয়া উচিত।

    আর বাজেট অধিবেশনে বাজেট নিয়ে কথা বলার আগে পরে অভিষেক কৌশলে বাজেটের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়, কিন্তু বাংলার অন্য ইস্যুকেও তুলে এনেছেন। তিনি বাংলা ভাষার ইস্যু এনেছেন, বাঙালির উপর অত্যাচারের ইস্যু এনেছেন, এনেছেন নারী নির্যাতন, অপরাধের প্রসঙ্গও। তবে কোনওটাই চেঁচামেচি করে নয়, একেবারে যুক্তিগ্রাহ্য পরম্পরা রক্ষা করে। তিনি বলেন,  'আমি এমন এক দেশের প্রতিনিধিত্ব করি, যেখানে জয় বাংলা বললে কিংবা আমার সোনার বাংলা গাইলে, তাঁকে অনুপ্রবেশকারী তকমা দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।' বাজেটে কী আছে, কী নেই, তা নিয়েও বিস্তারিত বলেন অভিষেক। উল্লেখ করেন, কীভাবে বাজেটে বাংলাকে উপেক্ষা করা হয়েছে। কীভাবে রেলমন্ত্রী থাকাকলীন মমতার ঘোষিত ফ্রেইড করিডর প্রকল্পকে এখন নতুন প্রকল্প বলে চালিয়ে দিচ্ছে কেন্দ্র। 

    অভিষেক দু'দিক সামলাচ্ছেন সমান দক্ষতায়। তিনি যখন মাটিতে থেকে কাজ করছেন, সংসদের বাইরে কাজ করছেন, সভা সমিতিতে বক্তব্য রাখছেন, সাধারণ মানুষের কাছে যাচ্ছেন, তখন তাঁর কথার শরীরের ভাষ পাল্টে যাচ্ছে আর তিনি যখন সংসদে তখন তিনি আলাদা। তখন তিনি সংসদীয় গণতন্ত্রের সমস্ত নিয়ম ও নিষ্ঠা মেনে আদর্শ সাংসদের মতো জোর গলায় তুলে ধরছেন তাঁর কথা। এমন এক ভারতবর্ষের কথা তিনি তুলে ধরছেন, যে ভারতবর্ষের দিকে তাকিয়ে আছে নতুন প্রজন্ম। আগামী দিনের সাংসদদের এভাবেই দেখতে চাইছে দেশ, বাংলা। সেই লড়াইয়ে আরও অনেকের থেকে বহুযোজন এগিয়ে গিয়েছেন অভিষেক।
  • Link to this news (আজকাল)