আজকাল ওয়েবডেস্ক: প্যালেস্টাইনের বর্তমান পরিস্থিতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা খুঁজতে গিয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. কে. পি. বসু মেমোরিয়াল হল যেন এক টুকরো প্যালেস্টাইন হয়ে উঠল।
১০ ও ১১ ফেব্রুয়ারি, এই দু’দিন ধরে সেখানে আয়োজন করা হয়েছে ‘প্যালেস্টাইন সলিডারিটি ফেস্টিভ্যাল’—একটি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রতিবাদের মঞ্চ, যেখানে শোক, রাগ, ইতিহাস ও সংহতি একসঙ্গে কথা বলে।
এই অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আব্দুল কাফি। উদ্বোধনী বক্তৃতায় তিনি কোনও রাখঢাক না রেখেই স্পষ্ট করে বলেন কেন আজ ইজরায়েলের নৃশংসতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া নৈতিক দায়িত্ব।
তাঁর কণ্ঠে উঠে আসে ইতিহাসের দীর্ঘ ছায়া—‘প্যালেস্টাইনকে খাবলে খুবলে খেয়েই ইজরায়েলের আত্মপ্রকাশ।’ এই একটি বাক্যেই যেন ঔপনিবেশিক আগ্রাসনের সম্পূর্ণ ইতিহাস ধরা পড়ে।
প্যালেস্টাইনের বর্তমান পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি এমন এক উপমা ব্যবহার করেন, যা শ্রোতাদের স্তব্ধ করে দেয়—‘কান্নাকে দূর থেকে কবিতার মতো দেখায়। তাই হয়তো প্যালেস্টাইনের মানুষ বোমার পতন দেখতে দেখতেও যা উচ্চারণ করেন, তা কবিতার মতোই শোনায়।’
এই কথার মধ্যে শুধু কাব্য নেই, আছে এক ভয়ানক সত্য—দীর্ঘদিনের দমন-পীড়ন মানুষকে এমন জায়গায় নিয়ে যায়, যেখানে যন্ত্রণাও ভাষা বদলে ফেলে।
কাফির বক্তব্যে উঠে আসে ইতিহাস, স্মৃতি এবং বর্তমান ভারতের সংখ্যালঘু অবস্থানের প্রশ্ন। তিনি দুঃখের সঙ্গে বলেন, 'আজকের দিনে সাম্রাজ্যবাদের আর কোনও মুখোশ নেই। আগ্রাসন এখন প্রকাশ্য, নৃশংসতা এখন সম্প্রচারযোগ্য দৃশ্য। প্যালেস্টাইনের ওপর চলা বর্বরতা তাই কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—এটি ক্ষমতার রাজনীতির ধারাবাহিক রূপ।'
এই প্যালেস্টাইন সংহতি উৎসবের আয়োজন করেন অর্ক ভাদুড়ি-সহ আরও কয়েকজন সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মী। কেন কলকাতায় প্যালেস্টাইন—এই প্রশ্নের উত্তরে অর্ক ভাদুড়ি বলেন, ‘কলকাতায় প্যালেস্টাইন কেন নয়? এই শহর জানে দেশভাগের ক্ষত কেমন হয়। নব্য দেশভাগের রক্তের স্বাদ কতখানি লবণাক্ত, তা বাংলার চেয়ে ভাল কেউ বোঝে না। দুর্ভিক্ষ কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তার স্মৃতি লেখা আছে কলকাতার রাজপথে, ফুটপাথে, মানুষের শরীরে। তাই প্যালেস্টাইনের পাশে দাঁড়ানো কোনও আবেগী সিদ্ধান্ত নয়—এটি এই শহরের রাজনৈতিক রায়।'
এই উৎসব আসলে কেবল প্রতিবাদের জায়গা নয়, এটি স্মরণ করার জায়গাও। মনে করিয়ে দেয়, অত্যাচার কখনও ভৌগোলিক সীমায় বন্দি থাকে না। এক দেশে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ে অন্য দেশেও—ভাষায়, সংস্কৃতিতে, রাজনীতিতে।
দু’দিনব্যাপী এই উৎসবে থাকছে থিয়েটার, সিনেমা, গান—প্রতিবাদের শিক্ষিত ও সাংস্কৃতিক রূপ। মঞ্চে নাটক যেমন কথা বলছে দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে, তেমনই সিনেমা তুলে ধরছে মানুষের দৈনন্দিন লড়াই, হারিয়ে যাওয়া ঘর, ছিন্নভিন্ন শৈশব।
গান হয়ে উঠছে শোকের ভাষা, আবার কখনও প্রতিরোধের স্লোগান। প্রথম দিন যেমন থাকছে শ্রুতি ঘোষের একক নাটক, তেমনই থাকছে অর্ক মুখার্জির নূর-এ-হক নামের গানের অনুষ্ঠানের পাশাপাশি হেরনান জিনের তথ্যচিত্র সিনেমা বর্ন ইন গাজা-এর প্রদর্শনী।
থাকছে অর্ক ভাদুড়ির সঞ্চালনায় সুজন দত্ত ও স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্যের আলোচনা। দ্বিতীয় দিন অনুষ্ঠান শুরু হবে এলিয়া সুলেমানের ফিচার সিনেমা দ্য টাইম দ্যাট রিমেইন্স দিয়ে। সারাদিন জুড়ে রয়েছে নানা আলোচনা।
থাকছে প্রিয়ক মিত্রর সঞ্চালনায় সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় ও শুদ্ধব্রত দেবের বিশেষ আলোচনা। আর এই কর্মসূচির শেষ অংশে থাকছে মনোজ্ঞ গানের অনুষ্ঠান। প্রতিবাদের ভাষায় যে গানেরা গলায় গলায় বেঁধে রাখে পৃথিবীকে।
এই আয়োজন প্রমাণ করে, প্রতিবাদ মানেই কেবল স্লোগান নয়। প্রতিবাদ মানে ভাবা, বোঝা, এবং অবস্থান নেওয়া। ‘প্যালেস্টাইন সংহতি উৎসব’ সেই অবস্থানেরই ঘোষণা—যেখানে দাঁড়িয়ে বলা যায়, নৃশংসতার বিরুদ্ধে নীরবতা কোনও নিরপেক্ষতা নয়, বরং অপরাধ।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. কে. পি. বসু মেমোরিয়াল হলের এই দু’দিন তাই শুধু একটি অনুষ্ঠানের সময়সূচি নয়। এটি এক রাজনৈতিক স্মারক—যেখানে কলকাতা আবার মনে করিয়ে দেয়, সে আজও অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে জানে, দূরের কান্নাকেও নিজের বলে চিনতে জানে।