দেবব্রত ঘোষ: লক্ষ্মীর ভান্ডার নিয়ে অবশেষে জটিলতা কাটল। অভিযোগ ছিল জেলার কয়েক হাজার মহিলারা আবেদন করেও টাকা পাচ্ছিল না। জেলা প্রশাসন সূত্রে খবর সেই টাকা দেবার প্রক্রিয়া চালু হয়ে গিয়েছে। খুব শীঘ্রই একাউন্টে টাকা চলে আসবে।
২০২১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন সরকার তৃতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর মহিলাদের জন্য রাজ্য জুড়ে লক্ষীর ভান্ডার প্রকল্প চালু করে। প্রথমে মহিলাদের পাঁচশ টাকা দেওয়া হলেও পরে তা বেড়ে এক হাজার টাকা এবং তফসিলি সম্প্রদায়ের মহিলাদের জন্য বারোশ টাকা বরাদ্দ করা হয়।
কিছুদিন আগে বিধানসভায় রাজ্য বাজেট পেশ করার সময় লক্ষ্মী ভান্ডার বাড়িয়ে পনেরশো টাকা এবং তফসিলি সম্প্রদায়ের জন্য সতেরশো টাকা করা হয়।
এরপরই হাওড়া সমাজকল্যাণ দপ্তরের সামনে সেই সমস্ত মহিলারা প্রতিদিন ভিড় জমাচ্ছেন যারা আবেদন করেও টাকা পাননি।
প্রিয়া চৌধুরী নামে এক মহিলা জানান আবেদন করার পর মোবাইলে ম্যাসেজ এসেছে অথচ টাকা পাচ্ছেন না। সরস্বতী কর্মকার নামে এক মহিলা বলেন, তার স্বামী নেই,পরের বাড়ি কাজ করেন। লক্ষ্মী ভান্ডারের টাকা পেয়ে উপকার হচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ টাকা বন্ধ করে দেয়। ফলে খুবই সমস্যায় পড়েছেন।
মহিলাদের বেশিরভাগই জানিয়েছেন তারা এক থেকে দেড় বছর আগে এই প্রকল্পের জন্য আবেদন করলেও কাজের কাজ কিছু হয়নি।
সরকারি সূত্রে খবর ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে যাদের নাম তালিকাভুক্ত হয়েছিল, তাদের ক্ষেত্রে সমস্যা হয়েছিল। তবে সেই সমস্যা মিটে গিয়েছে। টাকা দেবার প্রক্রিয়া চালু হচ্ছে। খুব তাড়াতাড়ি একাউন্টে টাকা জমা পড়বে।
লক্ষ্মীর ভান্ডার নিয়ে ইতিমধ্যে রাজনৈতিক চাপানউতর শুরু হয়েছে। বিজেপির হাওড়া জেলা সদরের সম্পাদক ওমপ্রকাশ সিংহ বলেন তৃণমূল এসআইআর লাইন নিয়ে সমালোচনা করছে। অথচ লক্ষ্মীর ভান্ডারের লাইন, এসআইআর এর দ্বিগুণ। মহিলারা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। মহিলারা তাদের প্রাপ্য টাকা পাচ্ছেন না। আসলে রাজ্য সরকার সম্পূর্ণ দেউলিয়া হয়ে গিয়েছে।
অভিযোগ উড়িয়ে রাজ্যের জনস্বাস্থ্য কারিগরী দফতরের মন্ত্রী পুলক রায় বলেন, মুখ্যমন্ত্রী এবার লক্ষী ভান্ডারের পাঁচশো টাকা বাড়িয়েছেন। যাঁরা এখনও পাচ্ছেন না, তাঁরা টাকা পেয়ে যাবেন। ভোটের আগে এই আশাতেই এখন মহিলারা তাকিয়ে আছেন কবে তাদের ব্যাংক একাউন্টে কবে টাকা ঢোকে।
কী ভাবে আবেদন করতে হয় লক্ষ্মীর ভান্ডারের জন্য?
দুয়ারে সরকার ক্যাম্প বা স্থানীয় প্রশাসনিক অফিসের মাধ্যমে লক্ষ্মীর ভান্ডারের জন্য আবেদন করা যায়।
লক্ষ্মীর ভান্ডার ও ভোটব্যাঙ্কের পাটিগণিত
মমতা বন্দ্যোপাধ্য়ায়ের লক্ষ্মীর ভান্ডার যে তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্কের বড় ভিত্তি, তা ইতিমধ্যেই প্রমাণিত। তাই এবার ছাব্বিশের ভোটের আগে মমতা যে লক্ষ্মীর ভান্ডারের বরাদ্দ বাড়াবেন, এমনটাই প্রত্যাশা ছিল। কারণ, ২০২৪ লোকসভা ভোটের আগে একলাফে দ্বিগুণ করা হয় লক্ষ্মীর ভান্ডারের। আর তার সুফলও মিলেছিল ভোটবাক্সে। মহিলা ভোটাররা দু-হাত উপুড় করে ভোট দিয়েছিল ঘাসফুলে। এবারও লক্ষ্মীর ভান্ডারে বরাদ্দ বাড়াতেই খুশি মহিলারা। বলছেন, আরেকটু সচ্ছ্বল হবে সংসার।
লক্ষ্মীর ভান্ডারের মোট উপভোক্তা
বর্তমানে ১ কোটি ৪১ লক্ষ মহিলা এই লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের সুবিধা পান। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে লক্ষ্মীর ভান্ডারের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল ২৭ হাজার কোটি টাকা। গত ৫ বছরে শুধুমাত্র এই প্রকল্পের মাধ্যমেই রাজ্যের মহিলাদের হাতে ৭৪ হাজার কোটি নগদ টাকার জোগান দিয়েছে মমতা সরকার। এখন ফের বিধানসভা ভোটের মুখে এই ভাতা বৃদ্ধিকে মমতার মাস্টারস্ট্রোক বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক মহল।
নির্বাচনে নির্ণায়ক লক্ষ্মীর ভান্ডার
উল্লেখ্য, বর্তমানে রাজ্যে মোট সাড়ে ৭ কোটি ভোটারের মধ্যে লক্ষ্মীর ভান্ডারের সুবিধাভোগী প্রায় ৩০ শতাংশ। এই বিপুল সংখ্যক ভোটদাতার মন জয়ে এই ভাতা বৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ। মত ওয়াকিবহল মহলের। ভোটবাক্সের সমীকরণে দেখা গিয়েছে, বিভিন্ন দুর্নীতি ইস্যু থাকা সত্ত্বেও, এই লক্ষ্মীর ভান্ডার নির্বাচনে নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেছে। তৃণমূলের দিকে হাওয়া ঘুরিয়ে দিয়েছে।