• বাঘ-চিতার শুভদৃষ্টি কুনোর দুয়ারে? রাজস্থানের শার্দূল হাজির মধ্যপ্রদেশের জঙ্গলে
    এই সময় | ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • শিলাদিত্য সাহা

    অনেকবার জঙ্গলে গিয়েছেন। কিন্তু বাঘ দেখতে পাননি? দুঃখ করবেন না। বাঘ ওরাও দেখতে পায়নি। বছরভর — শীত–গ্রীষ্ম–বর্ষা জঙ্গ‍লে থেকেও গত সাড়ে তিন বছরে একটিবারও বাঘের মুখদর্শন হয়নি ওদের। ওরা কুনো জাতীয় উদ্যানের (Kuno National Park) চিতা! এ বার হয়তো কপাল খুলতে চলেছে চিতাদের।

    কারণ, মধ্যপ্রদেশের এই সংরক্ষিত অরণ্যের দুয়ারে এসে হাজির হয়েছে একটি বাঘ। জানা যাচ্ছে, পড়শি রাজ্য রাজস্থানের রণথম্ভোর টাইগার রিজ়ার্ভ (Ranthambore Tiger Reserve) থেকেই নাকি সঙ্গিনীর খোঁজে হাঁটতে হাঁটতে পুরুষ বাঘটি (আরটি ২৫১২) কুনো পৌঁছেছে। বিখ্যাত বাঘিনি সুলতানার (টি ১০৭) ছে‍লে সে। আপাতত দিনকয়েক ধরে জঙ্গল সাফারির অন্যতম প্রবেশপথ টিকটোলি গেটের কাছে শুকনো পাতার উপরে শীতের রোদে গড়াগড়ি খাচ্ছে পুরুষ বাঘটি।

    মজার কথা, ২০২২–এর ১৭ সেপ্টেম্বর আফ্রিকার নামিবিয়া থেকে উড়িয়ে এনে কুনোর জঙ্গলে যখন ৮টি চিতাকে ছাড়া হয়েছিল, তখন ওই সংরক্ষিত অরণ্যে বাঘের বাসা বা নিদেনপক্ষে নিত্য যাতায়াত ছিল না। পরবর্তীতে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আরও ১২টি চিতা এসেছে কুনোয়। তার পরে দেশে জন্মানো শাবকদের ধরলে শুক্রবার পর্যন্ত কুনোয় ছিল ২৭টি চিতার (Cheetah) বসবাস। শনিবার সকালে মাদি িচতা আশার ৫টি শাবক জন্মানোর পরে সেই সংখ্যাটাই বেড়ে দাঁড়াল ৩২।

    কিন্তু গত সাড়ে তিন বছরে কুনোর জঙ্গলের ভিতরে কখনও বাঘ আসেনি। ফলে আফ্রিকা থেকে আসা এবং ভারতে জন্মানো চিতাদের কেউই কখনও বাঘ দেখেনি। আফ্রিকায় মুক্ত জঙ্গলে এমনিতেও রয়্যাল বেঙ্গলের (Royal Bengal Tiger) দেখা মেলে না। অর্থাৎ এই পুরুষ বাঘটি যদি কোনও ভাবে চিতার মুখোমুখি হয়, তা হলে ভারতে প্রথমবার খাদ্যশৃঙ্খলের শীর্ষে থাকা (প্রেডেটর) দুই প্রাণীর কার্যত ‘শুভদৃষ্টি’ হবে।

    কারণ মধ্যপ্রদেশের কুনোর ৩২টি এবং গান্ধীসাগরে থাকা তিনটি চিতা যেমন বাঘ দেখেনি, তেমনই বাঘও কোনওদিন মুক্ত জঙ্গলে চিতার মুখোমুখি হয়নি। বেশ কয়েকবার যদিও কুনোর চিতা জঙ্গল থেকে বেরিয়ে নদী, সড়ক পার করে রণথম্ভোরের কাছাকাছি চলে গিয়েছিল। তারা পা রেখেছে সদ্য টাইগার রিজ়ার্ভ তকমা পাওয়া মধ্যপ্রদেশেরই মাধব জাতীয় উদ্যানের কাছে। কিন্তু বাঘ–চিতার চারচক্ষুর মিলন — সরকারি ভাবে এখনও হয়ে ওঠেনি।

    সেই কারণেই বন্যপ্রাণ বিশেষজ্ঞদের কাছে পরিস্থিতিটা অভিনব। বাঘ–চিতা মুখোমুখি হলে তারা একে অন্যের সঙ্গে কেমন আচরণ করবে, জানা নেই কারও। কুনোর জঙ্গলে লেপার্ড রয়েছে। কদাচিৎ চিতাদের সঙ্গে তাদের সংঘাত পরিস্থিতি তৈরি হলেও মোটের উপরে দু’পক্ষ একে অন্যকে এড়িয়েই চলে বলে কুনোর বনকর্মীরা দেখেছেন। শিকার ধরা নিয়েও লেপার্ড–চিতার মধ্যে সংঘর্ষের নজির নেই। বরং চিতাদের দেখা গিয়েছে কুনোর জঙ্গলের বাইরে গ্রাম্য বসতি এলাকায় দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে তারা। বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের কাজে যুক্ত প্রবীণ আরটিআই কর্মী অজয় দুবের কথায়, ‘কুনোর চিতাদের কটাই বা মুক্ত জঙ্গলে (ফ্রি রেঞ্জ) আছে! এখনই এই বাঘটির থেকে ওদের কোনও ক্ষতির সম্ভাবনা নেই।’

    লাভ–ক্ষতি পরের কথা। কিন্তু বাস্তবের অঙ্কটা একটু আলাদা। কুনোর জঙ্গলে থাকা ২৭টি চিতার মধ্যে অন্তত ১৩টি মুক্ত জঙ্গলেই ঘোরাফেরা করছে। তার উপরে অতীতে দেখা গিয়েছে, জঙ্গল থেকে বেরিয়ে তারা রাজস্থানের দিকেই গিয়েছে — অর্থাৎ প্রায় সেই একই রুট, যা দিয়ে সুলতানার ছে‍‍লে রণথম্ভোর থেকে কুনোয় এসেছে। কুনোর চিফ কনজ়ারভেটর অফ ফরেস্ট উত্তম শর্মা যদিও জানাচ্ছেন, এই প্রথম নয়। এর আগেও একাধিক শীতকালে একটি পুরুষ বাঘ (সম্ভবত এটিই) কুনোর জঙ্গলের বাফার এলাকায় ঘোরাফেরা করেছে।

    তাঁর কথায়, ‘শীতকালে বাঘের মুভমেন্ট বেশি হয়। আর কুনোর আশপাশে একাধিক টাইগার ল্যান্ডস্কেপ রয়েছে। তাই কুনোর সাফারিতে এসে দর্শকরা আশপাশে বাঘ দেখতে পেয়ে গেলে আশ্চর্যের কিছু নয়। তবে বাঘ–চিতা মুখোমুখি হয়েছে — এমনটা এখনও আমরা দেখিনি। তা ছাড়া বাঘ এখানে আসে, কিছুদিন পরে ফিরেও যায়।’ এ দিকে মধ্যপ্রদেশে বন্যপ্রাণ নিয়ে কাজ করা গৌরব ভরদ্বাজের দাবি, পুরুষ বাঘটি গত ডিসেম্বরের শেষেই কুনোর জঙ্গলের কোর এরিয়ায় পা রেখেছে। রণথম্ভোর থেকে চম্বল ও পার্বতী নদী পার করে সে এসেছে প্রস্তাবিত চিতা করিডর দিয়ে।

    অতীতে রাজস্থানে বাঘ–চিতা ছিল। কিন্তু সে অন্তত আট দশক আগের কথা। তৎকালীন এশিয়াটিক চিতাদের সেই বংশ আজ এ দেশে অবলুপ্ত। বাঘও তার জিনগত বৈচিত্র অনেকটাই হারিয়েছে একটা সময়ে নির্বিবাদ চোরাশিকারের দাপটে। ফলে বর্তমানে রাজস্থানের রয়্যাল বেঙ্গল আর মধ্যপ্রদেশে থাকা আফ্রিকান চিতার ‘শুভদৃষ্টি’ হলে সেটা নজিরই গড়বে।

  • Link to this news (এই সময়)