সুপ্রকাশ মণ্ডল
সিপাই বিদ্রোহের তখনও ঢের দেরি। কলকাতায় সবে গুছিয়ে বসছে ব্রিটিশরা। একটা শহর থেকে সারা দেশ শাসন করতে যে পরিকাঠামো দরকার, তার অনেকটাই তৈরি। শহর বাড়ছে আড়ে–বহরে। একের পর এক অট্টালিকা তৈরি হচ্ছে। কলকাতার দ্রুত বদলাচ্ছিল ‘সিটি অফ প্যালেসেস’–এ।
তখনই শুরু সমস্যাটা। ঠান্ডার দেশের মানুষের কলকাতার জল-হাওয়া যে সইবে না, জানা কথাই। তবে ইংরেজদের আনাগোনা যত বাড়ল, পাল্লা দিয়ে বাড়ল রোগ। মৃত্যুহারও বাড়তে থাকল। ম্যালেরিয়া-ডেঙ্গি তো বটেই, কলেরা এবং ডায়েরিয়া নিত্যদিনের বিষয় হয়ে দাঁড়াল। সময়টা ১৮৩০। শহরে হাসপাতাল তৈরি করেছে ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি। দেখা গেল শুধু সাহেবরাই নয়, দেশের লোকেরাও একই রোগে ভুগছে। আমাশায় ভুগছে শহরের ৬৫ শতাংশ মানুষ। কারণ খোঁজা শুরু হলো। এমন এক সময়ে ১৮৩৬–এ বড়লাট হয়ে এলেন লর্ড অকল্যান্ড।
অকল্যান্ড দেখলেন, ম্যালেরিয়া, কলেরা, জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাজার হাজার ব্রিটিশ সৈন্য ও আধিকারিক মারা যাচ্ছেন। মৃত্যু-মিছিল ঠেকাতে মরিয়া হয়ে রোগের কারণ খুঁজতে নামার নির্দেশ দিলেন সাহেব। সেই সময়ে ‘প্রেসিডেন্সি সার্জন’ তথা ‘সার্জন টু দ্য নেটিভ হসপিটাল’ ছিলেন জেমস রনল্ড মার্টিন। তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হলো কলকাতার জনস্বাস্থ্য নিয়ে রিপোর্ট তৈরির। মার্টিন সাহেব শহরের রাস্তায় ঘুরে ঘুরে, পুরোনো নথি সংগ্রহ করে গবেষণা করেন। তাঁর গবেষণাপত্রটি বেঙ্গল মিলিটারি অরফ্যান প্রেস থেকে বই আকারে প্রকাশিত হয় ১৮৩৭–য়। নাম ‘মেডিক্যাল টোপোগ্রাফি অফ ক্যালকাটা’।
এই বইয়ে সেই সময়ের কলকাতার বিস্তারিত চিত্র রয়েছে। মার্টিন সাহেব এবং তাঁর দল প্রথম লক্ষ্য করেন কলকাতার নিকাশি ব্যবস্থাটাই ভুলে ভরা। শহরের অবস্থান গঙ্গা থেকে অন্তত দু’ফুট নীচে। কলকাতার নিকাশি নালা সবই গঙ্গা-মুখী। মার্টিন সাহেবের টিমের পর্যবেক্ষণ ছিল, কলকাতার জমি গঙ্গার দিক থেকে ধাপে ধাপে নিচু হয়ে পূর্ব দিকে জলা জমি (ইস্ট ক্যালকাটা ওয়েট ল্যান্ড) এবং নোনা জলের হ্রদের (সল্ট লেক বলে চিহ্নিত) দিকে চলে গিয়েছে। সেই নিকাশি নালাগুলো পরিকল্পিত ছিল না। ফলে বৃষ্টির বা বর্জ্য-জল শহরের বাইরে যেতে পারত না।
মার্টিন সাহেব লিখছেন, শহরের উত্তর দিকের নর্দমাগুলি সবই ছিল খোলা। তাতে সারা বছর পচা বর্জ্য, মল-মূত্র, আবর্জনা জমে থাকত। গরমে এই পচা পাঁক থেকে বিষাক্ত গ্যাস বের হতো। হুগলি নদীতে যখন জোয়ার আসত কিংবা বর্ষার সময়ে জল নর্দমা দিয়ে শহরে ঢুকত। এতে শহর নোংরা জলে ডুবে যেত। সেই জল সরতে অনেক দিন লাগত। এগুলি ছিল মাছি-মশার আড়ত। শহরের স্যানিটেশন ব্যবস্থাও ছিল অপরিকল্পিত। শুধু আলিপুর এলাকার নিকাশি ব্যবস্থা সাহেবকে কিছুটা সন্তুষ্ট করেছিল। কারণ, এই এলাকায় ইওরোপিয়ানদের বাস ছিল। এখানেই ছিল ওয়ারেন হেস্টিংস-এর প্রিয় ভিলা।
মার্টিন সাহেবের প্রস্তাব ছিল, শহরকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি মেনে নতুন করে খুঁড়ে মাটির নীচ দিয়ে নিকাশি জল নিয়ে যেতে হবে। যেগুলি গঙ্গামুখী না হয়ে পূর্ব কলকাতা জলাভূমি বা সল্টলেকমুখী হবে। মার্টিনের রিপোর্ট জমা পড়ার পরে ‘ফিভার হসপিটাল কমিটি’ গঠিত হয়। তাঁর প্রস্তাবের প্রায় দু’দশক পরে নিকাশি ব্যবস্থার আধুনিকীকরণের কাজ শুরু হয়। যদিও পরিকল্পনা শুরু হয়েছিল ১৮৪৫ থেকেই। ১৮৫৫–য় ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ার উইলিয়াম ক্লার্কের নেতৃত্বে সমগ্র পরিকল্পনা মিউনিসিপ্যাল কমিশনারের কাছে জমা পড়ে।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৮৫৯–এ কলকাতার এই আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক ভূগর্ভস্থ নিকাশি ব্যবস্থার অনুমোদন দেয়। ১৮৬০–এ কলকাতার প্রধান রাস্তাগুলির নীচে বড় বড় ইটের তৈরি নালা বা ‘ব্রিক সিওয়ার’ তৈরির কাজ শুরু হয়। এই নালা বৃষ্টির জল, বাড়ির নোংরা জল এবং পয়ঃপ্রণালীর বর্জ্য বহনে সক্ষম ছিল। ১৫ বছর ধরে চলে সেই কাজ। বর্ষার জমা জল বের করার জন্য ১৮৭৫–এর পরে পামার বাজার-সহ কয়েকটি পাম্পিং স্টেশন তৈরি করা হয়।
এ তো গেল আধুনিক নিকাশি ব্যবস্থার পত্তনের কথা। প্রায় সমসাময়িক সময়ে কলকাতায় ভূগর্ভস্থ পানীয় জল সররাহ ব্যবস্থাও চালু হয়। ইন্দোরের মতো বিপদ কলকাতায় আছে কি না, তা বুঝতে গেলে কলকাতার নিকাশি এবং পানীয় জল সরবরাহ ব্যবস্থাটা জানতে হবে।
কলকাতায় ভূগর্ভস্থ পাইপলাইনের মাধ্যমে পরিশ্রুত পানীয় জল সরবরাহ শুরু হয় ১৮৭০–এ। তবে এই প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছিল ১৮৬৫–তে। এই কাজের তদারকিতেও ছিলেন উইলিয়াম ক্লার্ক ও তাঁর টিম। শহরে জলের উৎস বলতে গঙ্গা। ইঞ্জিনিয়াররা খতিয়ে দেখলেন, কলকাতায় গঙ্গার জল নোংরা এবং ঘোলা। শেষ পর্যন্ত শহর থেকে ১৮ মাইল দূরের ২৪ পরগনার পলতাকে জল সরবরাহ কেন্দ্র হিসেবে বাছা হয়। তৈরি হয় জল শোধনাগার। গঙ্গার জল তুলে তা বালির মধ্যে দিয়ে পরিশ্রুত করা হতো। একে বলা হতো ‘স্লো-স্যান্ড ফিল্টার সিস্টেম’। ৪২ ইঞ্চি ব্যাসের কাস্ট আয়রন বা ঢালাই লোহার পাইপে করে পরিস্রুত সেই জল কলকাতায় পাঠানো হতো। পরে টালা ট্যাঙ্ক তৈরি হয়।
সেই সময় থেকেই যে সমস্যা ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ারদের চোখে পড়েছিল, তা হলো কলকাতার অপরিসর রাস্তা। সেই সময়ে রাস্তার একদিকে ছিল নিকাশি নালা। আর বেশিরভাগ জায়গায় উল্টো দিকে বসানো হয়েছিল জলের পাইপ। শহর যত আধুনিক হয়েছে, বেড়েছে জনসংখ্যা, বেড়েছে জলের চাহিদা। জল এবং নিকাশি লাইন ক্রমে কাছাকাছি এসেছে। কোথাও কোথাও একই সঙ্গে এগিয়েছে এই দুই লাইন। কেমন সে সমস্যা, যা কলকাতাতেও ডেকে আনতে পারে ইন্দোরের মতো বিপদ? (চলবে)