সাইবার অপরাধের হেল্পলাইন চালু, তবু পুলিশের দীর্ঘসূত্রতা কমবে কি
আনন্দবাজার | ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
কখনও অভিযোগ ওঠে, ভুয়ো ডিজিটাল গ্রেফতারির শিকার হওয়া ব্যক্তিকে থানা থেকে বলে দেওয়া হয়েছে, ‘টাকা কি পুলিশকে জিজ্ঞাসা করে দিয়েছিলেন?’ কখনও বলা হয়, ‘ওটিপি যখন নিজে দিয়েছেন, তা হলে নিজেই গিয়ে অপরাধীকে ধরে আনুন’। কখনও আবার মাসের পর মাস থানায় ঘোরার পরেও শুনতে হয়, ‘এমন বহু মামলার পাহাড় জমে আছে। অভিযোগ করে যান, পরে দেখা হবে।’ এমনও অভিযোগ সামনে আসে, যেখানে প্রতারণায় খোয়া যাওয়া টাকার অঙ্ক শোনার পরে পুলিশ বলেছে, ‘এ আর এমন কী! কোটি কোটি টাকা ভ্যানিস হয়ে যাচ্ছে। অল্প টাকার মায়া ছেড়ে দিন।’
সাইবার-সুরক্ষায় লালবাজার সর্বক্ষণের হেল্পলাইন নম্বর (১৮০০৩৪৫০০৬৬) চালু করার পরে কি এমন হয়রানি থেকে রেহাই পাবেন প্রতারিতেরা? সুরাহা পেতে থানায় থানায় ঘুরে নাজেহাল হওয়ার দিন কি তবে শেষ হবে? ভুক্তভোগী থেকে সাইবার বিশেষজ্ঞদের মনে এমনই নানা প্রশ্ন ঘুরছে। লালবাজার সূত্রে যদিও দাবি করা হয়েছে, প্রতারিত হওয়ার পরে কী করতে হবে, তা বুঝে উঠতেই অনেকটা সময় চলে যায়। অভিযোগ দায়ের করতেই যে থানায় থানায় ঘুরে বেড়াতে হয়, সেই বিষয়টিও পুলিশকর্তাদের অজানা নয়। সর্বক্ষণের হেল্পলাইনএই সমস্যা মেটাতেই তৈরি করা হয়েছে। উদাহরণ হিসাবে জানানো হয়েছে, নম্বরটি চালু হওয়ার পরে বুধবারই উল্টোডাঙা থেকে এক জন ফোন করে জানান, তাঁকে ডিজিটাল গ্রেফতারির ভয় দেখানো হয়েছিল। টোল-ফ্রি নম্বরে ফোন করে বিষয়টি জানিয়ে তিনি সুরাহাপেয়েছেন। পুলিশ প্রতারকের সংশ্লিষ্ট নম্বরটি ব্লক করানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
লালবাজারের এক কর্তার দাবি, ‘‘প্রতি মাসে কলকাতা পুলিশ এলাকায় গড়ে এক হাজারটি সাইবার প্রতারণার অভিযোগ জমা পড়ে। ‘ডিজিটাল প্রহরী’ নামে নতুন হেল্পলাইন নম্বর চালু করার পর থেকে প্রচুর ফোন আসছে। শুধু কলকাতা নয়, কলকাতার বাইরের জেলা থেকেও ফোন করে সাহায্য চাইছেন অনেকে।’’ নগরপাল সুপ্রতিম সরকারও জানিয়েছেন, প্রতারিত হওয়ার পরের কয়েক ঘণ্টার গুরুত্ব অপরিসীম। সেইকারণেই ওই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে যাতে প্রতারিত ব্যক্তি পুলিশের সাহায্য পান, তার জন্যই এই নতুন নম্বর চালু করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী অনেকেই অবশ্য দাবি করছেন, বহু ক্ষেত্রেই প্রতারণার ঘটনা ঘটছে রাজ্যের বাইরের কোনও জায়গা থেকে। কিন্তু টাকার অঙ্ক বিচার করে বহু ক্ষেত্রেই সেখানে পুলিশ পাঠানো নিয়ে গড়িমসি করা হয়। যত ক্ষণে পুলিশ ওই সমস্ত এলাকায় পৌঁছয়, তত ক্ষণে সিম কার্ড বদলে, হাতিয়ে নেওয়া টাকা একাধিক অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দিয়ে কার্যত ‘ভ্যানিস’ হয়ে যায় প্রতারকেরা।কোনও ভাবে প্রতারক ধরা পড়লেও যে ফোন, ল্যাপটপ বা কম্পিউটার ব্যবহার করে প্রতারণা করা হয়েছে, তা পুলিশ উদ্ধার করতে না পারায় বিচার চলাকালীন কিছুটা সুবিধা পেয়ে যায় অভিযুক্ত। অভিযোগ, কেন্দ্রীয় সরকারের সাইবার অপরাধ সংক্রান্ত নালিশ জানানোর পোর্টালে অভিযোগ জানিয়েও সুরাহা মিলছে না। সাইবার গবেষক ঋদ্ধিমান সরকার বললেন, ‘‘ন্যাশনাল সাইবার ক্রাইম রিপোর্টিং পোর্টাল আর ১৯৩০ টোল-ফ্রি নম্বর চালু রয়েছে। একটি ইন্ডিয়ান সাইবার ক্রাইম কোঅর্ডিনেশন সেন্টার তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু টাকা ফেরানোর পদ্ধতি এখনও দীর্ঘসূত্রতায় আটকে। টোল-ফ্রি নম্বর বা কেন্দ্রীয় সরকারি পোর্টালে গিয়ে অভিযোগ দায়ের করলে একটি জিডি (জেনারেল ডায়েরি) তৈরি হয়। সেই জিডি নিয়ে এর পরে ব্যাঙ্কের শাখায় ম্যানেজারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়। ব্যাঙ্ক এই সময়ে চাইলেই খোয়া যাওয়া টাকা ‘ফ্রিজ়’ করতে পারে এবং ‘রিভার্স’ করতে পারে। কিন্তু এই কাজে ব্যাঙ্ক গড়িমসি করলে দ্রুত আদালতে আর্জি জানিয়ে একটি অর্ডার বার করতে হয়।’’ এর পরে সেই অর্ডার দেখালে ব্যাঙ্ক পদক্ষেপ করতে বাধ্য। কিন্তু কোনও সাধারণ মানুষের পক্ষে কি এত দ্রুত আদালতের নির্দেশ বার করা সম্ভব?
লালবাজারের দাবি, এ ক্ষেত্রে কী করণীয়, নতুন টোল-ফ্রি নম্বরে সে ব্যাপারেও পরামর্শ দেওয়া হবে। কিন্তু পুলিশ তো আগেও আদালতের ব্যাপারে সাহায্য করত। ভুক্তভোগীদের অবশ্য দাবি, সবটাই নির্ভর করত পুলিশকর্মীর সদিচ্ছার উপরে। এ ক্ষেত্রেও সবটাই সেই সদিচ্ছার উপরেই নির্ভর করবে কি? এ প্রশ্নের অবশ্য উত্তর মিলছে না।