এই সময়: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বন্দে মাতরম’ (Vande Mataram)–এর প্রথম দু’টি স্তবকের বদলে ছ’টি স্তবককে ‘জাতীয় গান’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে নির্দেশিকা জারি করেছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের সেই নির্দেশিকাতেই ‘বন্দে মাতরম’–এর বিকৃত লিরিক্স (বাণী) মুদ্রিত হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছে তৃণমূল।
নির্দেশিকায় মুদ্রিত লিরিক্স এবং ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসের লিরিক্স এক্স হ্যান্ডলে বৃহস্পতিবার রাতে পাশাপাশি পোস্ট করেছে রাজ্যের শাসকদল। তাদের দাবি, ‘আনন্দমঠ’–এ ‘বন্দে মাতরম’–এর তৃতীয় স্তবকের সঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নির্দেশিকায় মুদ্রিত তৃতীয় স্তবকের মিল নেই।
তৃণমূলের (Trinamool) এক্স হ্যান্ডলে লেখা হয়েছে, ‘সংসদের মধ্যে ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) বঙ্কিমদা বলেছিলেন। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুর বন্দে মাতরমকে বলেছিলেন বন্দে–ভারত। এখন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নির্দেশিকায় আনন্দমঠে ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বন্দে মাতরমের যে লিরিক্স লিখেছিলেন, তা–ই বিকৃত করা হয়েছে। এই কারণেই বিজেপি বাংলা–বিরোধী।’ তৃণমূলের এই অভিযোগের কোনও প্রতিক্রিয়া কেন্দ্রের তরফে বৃহস্পতিবার পাওয়া যায়নি। তৃণমূলের আরও অভিযোগ, ‘জনগণমন’র আগে জাতীয় গান গাওয়ার যে নির্দেশ মোদী সরকার দিয়েছে, তা আদতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ছোট করার প্রচেষ্টা। পশ্চিমবঙ্গে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের দিকে তাকিয়েই এটা করা হয়েছে বলে শাসকদলের অভিযোগ।
তৃণমূল ভবনে বৃহস্পতিবার শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু বলেন, ‘আমরা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে সম্মান করি। আমরা বন্দে মাতরমকে সম্মান করি। কিন্তু বিজেপি কী ভাবে এটা তুলে ধরছে? আসলে ওরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জনগণমনকে ছোট করতে চাইছে। আমরা স্পষ্ট বলছি ওরা রবীন্দ্রনাথকে পছন্দ করে না। কারণ তিনি ধর্মনিরপেক্ষ ছিলেন। তিনি সারা জীবন হিন্দু মুসলিম ঐক্যের কথা বলেছেন। ওরা বন্দে মাতরম বা বঙ্কিমচন্দ্রকে গ্লোরিফাই করতে চায় না, ওরা রবীন্দ্রনাথকে ছোট করতে চাইছে।’ ২০২৬–এর বিধানসভা ভোট মিটে গেলে গেরুয়া শিবির আর বঙ্কিমচন্দ্রকে নিয়ে উচ্চবাচ্য করবে কি না, তা নিয়ে সন্দিহান তৃণমূল নেতৃত্ব।
জাতীয় পতাকা উত্তোলনের সময় থেকে স্কুলে প্রার্থনার সময়ে ‘বন্দে মাতরম’–এর ছ’টি স্তবক গাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে মোদী সরকার। যদিও ব্রাত্যর সাফ কথা, ‘এই নির্দেশ মাসতিনেকের জন্য কার্যকর হবে। বাংলার ভোটের দিকে তাকিয়ে এটা (কেন্দ্র সরকার) করেছে। বাংলার ভোটের পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে আবার শপথ নেবেন। তখন দেখবেন এটা কোথায় গাওয়া হবে। বঙ্কিমকে নিয়ে (বিজেপির) যে এত শ্রদ্ধা, বাগাড়ম্বর — কোথায় যেন মিলিয়ে যাবে।’
রবীন্দ্রনাথের পরামর্শেই ১৯৩৭–এ জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে ‘বন্দে মাতরম’–এর প্রথম দু’টি স্তবক জাতীয় গান হিসেবে গাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কবিগুরুর সেই সিদ্ধান্তকে বদল করা আদতে রবীন্দ্রনাথকে ছোট করা বলে তৃণমূল নেতৃত্ব মনে করছেন। যদিও কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার বলেছেন, ‘ব্রাত্য বসু অর্বাচীনের মতো কথা বলছেন। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বকবি, তিনি আমাদের সকলের শ্রদ্ধেয়, তিনি এমন এক নক্ষত্র যিনি কারও দ্বারা ম্লান হতে পারেন না। কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্রকে শ্রদ্ধা করলে কি অন্য কাউকে অপমান করা হয়? কোন মূর্খের মতো কথা বলছেন শিক্ষামন্ত্রী!’
তৃণমূল নেতৃত্বের বক্তব্য, গেরুয়া শিবির কোনও দিনই রবীন্দ্রনাথকে পছন্দ করে না। ব্রাত্যর কথায়, ‘আরএসএস থেকে হিন্দু সাম্প্রদায়িক সংগঠনগুলি কখনওই রবীন্দ্রনাথকে পছন্দ করেনি। রবীন্দ্রনাথকে তারা দীর্ঘদিন ধরে ছোট করতে চাইছিল। এই সরকারি নির্দেশের মধ্যে দিয়ে বঙ্কিমকে বড় করার নামে আসলে তাঁরা রবীন্দ্রনাথকে ছোট করল।’
সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তী বলেছেন, ‘দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে আরএসএস–বিজেপির পূর্বসূরিরা ছিলেন না। বন্দে মাতরমের সঙ্গে ওঁদের তো কোনও সম্পর্ক নেই। বন্দে মাতরমের কোন কোন স্তবক গাওয়া হবে, সেটা রবীন্দ্রনাথ ঠিক করেছিলেন। অমিত শাহ কি গুরুদেবের থেকেও বড় বোদ্ধা?’ পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন নির্বাচনের পাশাপাশি ড্যামেজ কন্ট্রোল করতেও মোদী সরকার এই পদক্ষেপ করেছে বলে তৃণমূল মনে করছে। রাজ্যের অর্থমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য তৃণমূল ভবনে এ দিন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ওই বঙ্কিমদা বলার পরে এখন কী ভাবে সেখান থেকে রিকভার করা যায়, সেটাই বিজেপি ভাবছে। প্রধানমন্ত্রী নিজে বন্দে মাতরমের সব স্তবক যদি সঠিক উচ্চারণ করতে পারেন, তা হলে বুঝব কিছু একটা করেছেন।’