• ভোটের আগে ইস্তেহার বানাতে অভিনব কৌশল নিল সিপিএম
    আজকাল | ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • আজকাল ওয়েবডেস্ক: বাংলার বাস্তব রাজনৈতিক অঙ্ক বলছে, সিপিআই(এম) ও বামফ্রন্ট গত ১৪ বছরে তৃণমূলের কাছে হারানো রাজনৈতিক জমি আর ফিরে পায়নি। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় তাদের কোনও বিধায়ক নেই, লোকসভাতেও নেই কোনও সাংসদ। ভোট শতাংশের নিরিখেও পতন স্পষ্ট—২০০৯ সালে সিপিআই(এম)-এর ভোট ছিল ৩৩.১ শতাংশ। তা কমে ২০১৯ সালে দাঁড়ায় ৬.৩ শতাংশে এবং ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে আরও নেমে ৫.৭ শতাংশে পৌঁছয়। সেই নির্বাচনে দল একটি আসনও জিততে পারেনি। একের পর এক পরাজয়ে জনবিচ্ছিন্নতাকেই চিহ্নিত করা হয়েছে দলের নির্বাচনী বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে। এই পরিস্থিতিতে ডিজিটাল কৌশলে মানুষের আস্থা ফেরানোর জন্য অভিনব কৌশল নিয়েছে সিপিএম।

    “বাংলার ভবিষ্যৎ গড়ে তুলুন: আপনার মতামত, আমাদের ইস্তেহার”—এই স্লোগানকে সামনে রেখে রাজ্যে নতুন জন-উদ্যোগ শুরু করল Communist Party of India (Marxist)–এর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি। তাদের আহ্বান, “এ লড়াই বাঁচার লড়াই, বাংলা বাঁচানোর লড়াই”—আর সেই লড়াইয়ের ইস্তেহার তৈরিতে সরাসরি অংশ নিন সাধারণ মানুষ। শুক্রবার এ বিষয় সাংবাদিক বৈঠকে রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম জানান সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মতামত নিয়ে একটা নির্বাচনী ইস্তেহার তৈরী উদ্যোগ নিয়েছেন তাঁরা। এই বিষয় একটি ওয়েবসাইটের উদ্বোধন করা হয় এদিনের সাংবাদিক বেঠক থেকে। উদ্বোধন করেন সিপিএম-এর সর্ব ভারতীয় সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি- 'বাংলা বাঁচাও ডট কম'। 

    সেলিম জানান, আসন্ন রাজনৈতিক পর্বকে সামনে রেখে তারা জনমতের ভিত্তিতে একটি বিকল্প উন্নয়ন রূপরেখা তৈরি করতে চায়। সেই লক্ষ্যে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য, শিল্পায়ন থেকে শুরু করে পরিবেশ ও নারী সুরক্ষা—বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে নাগরিকদের মতামত চাওয়া  হয়েছে। “আপনার পরামর্শ জমা দিন”—এই আহ্বানকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই দলীয় ওয়েবসাইট ও সংগঠন মারফত মত সংগ্রহ শুরু হয়েছে। ওয়েবসাইটের QR কোডে ক্লিক করলেই নির্দিষ্ট ইস্যুতে মতামত জানবার অপশন রাখা হয়েছে একটি পোস্টারে।

    উদ্বোধন হওয়া ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, স্কুল ও কলেজে শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও নিয়মিত করতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা শূন্যপদ দ্রুত পূরণ করার দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি শুধু বইভিত্তিক শিক্ষার পরিবর্তে কারিগরি ও হাতে-কলমে কাজের প্রশিক্ষণকে পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে, যাতে শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের যোগ আরও দৃঢ় হয়।

    সিপিএমের তরফে দাবি, রাজ্য সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা শূন্যপদ নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে স্বচ্ছ পরীক্ষার মাধ্যমে পূরণ করতে বলা হয়েছে। অস্থায়ী কর্মীদের নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, সামাজিক সুরক্ষা এবং বিমা নিশ্চিত করার দাবিও তোলা হয়েছে। অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের জন্য মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ন্যূনতম মাসিক মজুরি নির্ধারণ এবং তা কঠোরভাবে কার্যকর করার কথাও প্রস্তাবে রয়েছে। ভিনরাজ্যে কর্মরত শ্রমিকদের জন্য দুর্ঘটনা বিমা এবং তাঁদের পরিবারের স্বাস্থ্য ও শিক্ষার নিশ্চয়তার দাবিও তোলা হয়েছে।

    গ্রামীণ এলাকায় মাইক্রোফিন্যান্স সংস্থার চড়া সুদের হার নিয়ন্ত্রণে কড়া আইন প্রণয়ন এবং নজরদারি ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মাধ্যমে সরকারি ব্যাংক থেকে নামমাত্র সুদে ঋণের ব্যবস্থা করে বেসরকারি ঋণের ফাঁদ থেকে গ্রামীণ মহিলাদের মুক্ত করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

    স্থানীয় স্তরে ক্ষুদ্র শিল্প গড়ে তুলতে সরকারি সহায়তা ও সহজ ঋণের ব্যবস্থা, বড় বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বন্ধ কলকারখানা চালু করার পরিকল্পনা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। গ্রামীণ মহিলাদের আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সরকারি গ্যারান্টিতে সুদমুক্ত ঋণের সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে। গ্রাম ও ব্লক স্তরের হাসপাতালেই উন্নত চিকিৎসা ও বিশেষজ্ঞ ডাক্তার নিশ্চিত করে ‘রেফার কালচার’ বন্ধ করার কথা বলা হয়েছে। সমস্ত সরকারি হাসপাতালে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ ও প্রয়োজনীয় ল্যাবরেটরি পরীক্ষা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করার দাবিও রাখা হয়েছে।

    মহিলাদের আর্থিক স্বনির্ভরতার লক্ষ্যে ক্ষুদ্র ব্যবসায় যুক্ত স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলিকে সুদমুক্ত ঋণ দেওয়ার পাশাপাশি নিরাপত্তা জোরদারে বিশেষ ‘পিঙ্ক পুলিশ স্কোয়াড’ মোতায়েনের প্রস্তাব রয়েছে। প্রতিটি পৌরসভা ও ব্লকে আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে আবর্জনা ব্যবস্থাপনার স্থায়ী সমাধান এবং শিল্পাঞ্চল ও শহরে বাধ্যতামূলক বনায়ন ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে।

    দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এটি একমুখী ইস্তেহার নয়; বরং মানুষের মতামতের ভিত্তিতেই তৈরি করা হবে একটি যৌথ অঙ্গীকারপত্র। কেউ যদি আরও গুরুত্বপূর্ণ দাবি বা তথ্য যোগ করতে চান, তার জন্যও আলাদা সুযোগ রাখা হয়েছে। কলকাতার আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে অবস্থিত রাজ্য দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, ফোন, ইমেল বা সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে মতামত পাঠানো যাবে।

    রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে সিপিআই(এম) রাজ্যে একটি বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক সংলাপের পরিবেশ তৈরি করতে চাইছে। “বাংলা বাঁচানোর লড়াই”—এই আবেগঘন আহ্বানকে সামনে রেখে দল যে জনভিত্তি মজবুত করার কৌশল নিচ্ছে, তা স্পষ্ট।এখন দেখার, সাধারণ মানুষ কতটা সাড়া দেন এবং সেই মতামতের ভিত্তিতে চূড়ান্ত ইস্তেহার কতটা ভিন্ন ও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।
  • Link to this news (আজকাল)