• শুধু প্রেম নয়, রক্তেও লেখা ভ্যালেন্টাইন্স ডে
    এই সময় | ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • এই সময়: টানা দু’দিন বন্ধ ছিল জম্মু–শ্রীনগর ৪৪ নম্বর জাতীয় সড়ক। রাস্তা খুলতেই আড়াই হাজারের বেশি সেন্ট্রাল রিজ়ার্ভ পুলিশকে নিয়ে ৭৮টি গাড়ির একটি কনভয় যাচ্ছিল। অবন্তিপুরার কাছে লেথপুরায় দুপুর সোয়া তিনটে নাগাদ বিস্ফোরক বোঝাই একটি গাড়ি নিরাপত্তা বাহিনীর একটি বাসে সজোরে ধাক্কা মারে।

    ভয়াবহ বিস্ফোরণে ৭৬তম ব্যাটালিয়নের ৪০ জন সিআরপিএফ জওয়ান মারা যান। পাকিস্তানের জঙ্গি সংগঠন জইশ-ই-মহম্মদ এই হামলার দায় স্বীকার করে। এই আক্রমণের তীব্রতার চেয়েও গোটা দুনিয়া চমকে গিয়েছিল জঙ্গিদের আক্রমণের দিন নির্বাচনে। সেটা ছিল ২০১৯–এর ১৪ ফেব্রুয়ারি। ভ্যালেন্টাইন্স ডে–তে রক্তগঙ্গা বয়েছিল ভূস্বর্গে।

    ৭ ফেব্রুয়ারি থেকেই শুরু হয়ে যায় ‘ভ্যালেন্টাইন্স উইক’। ওই দিনটা রোজ় ডে। তারপর এক এক করে প্রপোজ় ডে, চকোলেট ডে, টেডি ডে, প্রমিস ডে, হাগ ডে, কিস ডে এবং শেষ দিন ভ্যালেন্টাইনস ডে। আধুনিক দুনিয়া ১৪ ফেব্রুয়ারিকে ‘প্রেমের দিন’ বলে চিহ্নিত করলেও এর ইতিহাস শুরু ক্ষেত্রেই রক্তাক্ত। যাঁর নামে এই দিনটি পালন করা হয়, সেই সেন্ট ভ্যালেন্টাইন ছিলেন খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতকের এক সাধারণ যাজক। সে সময়ে রোমে রাজত্ব করছেন সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াস।

    ইতিহাস এই রোমান সম্রাটকে ‘ক্লডিয়াস দ্য ক্রুয়েল’ অর্থাৎ ‘নিষ্ঠুর ক্লডিয়াস’ নামেই চিনত। সম্রাটের ধারণা হয়েছিল, রোমান সেনাবাহিনীতে পুরুষরা যোগ দিতে চাইছেন না কারণ তাঁরা স্ত্রী ও প্রেমিকাদের মায়ায় আটকে যাচ্ছেন। সমাধান হিসেবে তিনি বিয়ে এবং বাগদান নিষিদ্ধ করেন। ভ্যালেন্টাইন বুঝেছিলেন এটা অন্যায়। তাই তিনি লোকচক্ষুর আড়ালে গোপনে যুগলদের বিয়ে দেওয়া শুরু করেন। সম্রাট ক্লডিয়াস তা জানার পর ভ্যালেন্টাইনের মাথা কাটার করার আদেশ দেন। ২৭০ খ্রিস্টাব্দের ১৪ই ফেব্রুয়ারি ভ্যালেন্টাইনের মৃত্যু হয়। সুতরাং ভ্যালেন্টাইন্স ডে–র লাল গোলাপ শুধু প্রেমের রঙে নয়, সেন্ট ভ্যালেন্টাইনেতর রক্তেও রঙিন। প্রেমের দিনে রক্তপাতের নজির আরও আছে।

    ১৯৪৫–এর ১৪ ফেব্রুয়ারি দিনটা আজও মনে রেখেছেন চেক রিপাবলিকের রাজধানী প্রাগের মানুষ। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একেবারে শেষ পর্যায়। চেক রিপাবলিকের নাম তখন চেকোস্লোভাকিয়া। মিত্রশক্তির বিমানবাহিনীর এইটথ এয়ার ফোর্স স্কোয়াড্রন জার্মানির ড্রেসডেন শহরে বোমা ফেলতে গিয়েছিল। ন্যাভিগেশনের ভুলে ৪০টি বি-১৭ ফ্লাইং ফোর্টেস-এর একটি স্কোয়াড্রন বোমা ফেলেছিল ড্রেসডেন থেকে ৭৫ মাইল দূরে প্রাগের উপরে। মৃত্যু হয় ৭০১ জনের। আহত হন প্রায় ১২০০ জন।

    এখানেই শেষ নয়। ১৯৮১–র ১৪ ফেব্রুয়ারি দিনটা আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাবলিন–এর বাসিন্দাদের মনে আজও দগদগে ঘায়ের মতো। শহরের ‘স্টারডাস্ট নাইটক্লাব’–এ ভ্যালেন্টাইনস ডে-র ডিস্কো পার্টি চলছিল। মাঝরাতে হঠাৎই আগুন লেগে যায় ক্লাবের ছাদে। উৎসবের মেজাজ আর কানফাটানো মিউজ়িকে কেউই প্রথমে আগুনটা খেয়াল করেননি। কিছুক্ষণ পরে প্রচণ্ড তাপে ছাদের ধাতব অংশ গলে লোকজনের মাথায় পড়তে শুরু করে। এরপর শুরু হয় হুড়োহুড়ি আর আতঙ্ক। পার্টিতে আসা ৮৪১ জনের মধ্যে ৪৮ জন ঝলসে মারা যান। জখম হন অন্তত ২০০ জন।

    দিনটা ‘ভালোবাসার’ বলে পালিত হলেও এর শুরু সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের মৃত্যু দিয়ে। তার পর বারে বারে ১৪ ফেব্রুয়ারি রক্তে স্নান করেছে। তাই গোলাপের রং যে শুধু ভালোবাসার, এমনটা মনে করার কোনও কারণ নেই।

  • Link to this news (এই সময়)