• স্বাস্থ্যসাথী কার্ড থাকলেও বিল মেটান আপনি? মানতে নারাজ চন্দ্রিমা
    এই সময় | ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • এই সময়: রাজ্যে স্বাস্থ্যবিমার কভারেজ বাড়লেও সাধারণ মানুষের পকেট থেকে স্বাস্থ্য খাতে খরচ কমছে না। এক আন্তর্জাতিক গবেষণার প্রাথমিক রিপোর্টে উঠে এল এমনই উদ্বেগজনক চিত্র। বিশেষ করে রাজ্য সরকারের প্রকল্প স্বাস্থ্যসাথীর কার্যকারিতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন গবেষকরা।

    স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য (Chandrima Bhattacharya) এই সমীক্ষায় প্রাপ্ত তথ্যের সঙ্গে সহমত নন। তাঁর বক্তব্য, ‘লক্ষ লক্ষ মানুষ স্বাস্থ্যসাথীতে উপকৃত হয়েছে। সম্প্রতি বাজেট বক্তৃতাতেও সেই পরিসংখ্যান আমরা তুলে ধরেছি। আর আমাদের সরকারি হাসপাতালের পরিষেবাও সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। সেখানে একটি টাকাও রোগীদের খরচ করতে হয় না।’

    ইউকে-এর ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন এবং ভারতের ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির যৌথ উদ্যোগে এই সমীক্ষা চালানো হয়েছে। গবেষণাটি ২০২২ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত চলা একটি আন্তর্জাতিক প্রকল্পের অংশ, যার অর্থ সাহায্য করেছে ইউকে-এর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর হেলথ অ্যান্ড কেয়ার রিসার্চ। এই রিপোর্টটি প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের সংস্থা প্রতীচী ট্রাস্টও।

    ২০২৪–এর জুন থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ, পশ্চিম বর্ধমান, জলপাইগুড়ি এবং উত্তর ২৪ পরগনা — এই চার জেলায় গৃহভিত্তিক সমীক্ষা চালানো হয়। মোট ২,৫২৫টি পরিবার এবং ১০,২৩৫ জন ব্যক্তিকে নিয়ে সমীক্ষা করা হয়। এর নমুনা সংগ্রহের জন্য ইএসআই আধিকারিক, হাসপাতাল কর্মী, নিয়োগকর্তা ও কোনও না কোনও স্বাস্থ্যবিমা রয়েছে এমন ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে।

    সমীক্ষা বলছে, রাজ্যে ৭২ শতাংশ মানুষই শুধুমাত্র স্বাস্থ্যসাথীর আওতায় হেলথ্‌ কভারেজে রয়েছেন। কভারেজের নিরিখে এটি দেশের মধ্যে অন্যতম উচ্চস্থানে রয়েছে। অথচ সমীক্ষায় উঠে এসেছে যে, স্বাস্থ্যসাথীর আওতায় থাকলেও হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরে মাত্র ১৬.৬ শতাংশ প্রকল্পটির সুবিধে পেয়েছেন। অর্থাৎ বিমা কার্ড থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোগীদের নিজস্ব পকেট থেকেই খরচ মেটাতে হয়েছে।

    এর পিছনে উঠে এসেছে বিবিধ কারণ। মূল কারণ — এক, হাসপাতালের রিফিউজ়াল। দুই, সংশ্লিষ্ট হাসপাতালটি স্বাস্থ্যসাথীর তালিকাভুক্ত না থাকা। তিন, নির্দিষ্ট চিকিৎসা পরিষেবা প্যাকেজে অন্তর্ভুক্ত না হওয়া এবং দীর্ঘ অপেক্ষা এবং সরবরাহ-সংক্রান্ত সমস্যা। বহু ক্ষেত্রেই দেখা গিয়েছে, সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হলেও ওষুধ ও ডায়াগনস্টিক পরীক্ষার জন্য বাইরে থেকে খরচ করতে হচ্ছে মানুষকে।

    রিপোর্ট অনুযায়ী, স্বাস্থ্যসাথীর কভারেজ থাকলেও হাসপাতালে ভর্তির পরে রোগীদের খরচ হয়েছে ৬,৬০০ থেকে ১৯,৪৪৯ টাকা। এর মধ্যে রয়েছে ওষুধ ও ডায়াগনস্টিক পরীক্ষায় খরচ। তুলনায় ইএসআই প্রকল্পে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরে খরচ অনেক কম — প্রায় ৬,৫৭৪ টাকা। ইএসআই হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের ৫৯.৪ শতাংশ প্রকল্পটি ব্যবহার করেছেন, যা স্বাস্থ্যসাথীর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

    গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, যে শ্রেণির মানুষ স্বাস্থ্যসাথী কার্ডের উপরে নির্ভরশীল, ওপিডিতে ডাক্তার দেখাতে গিয়েই স্বাস্থ্যখাতে তাঁদের প্রচুর টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে। বহু রোগী তাই স্ব-চিকিৎসায় ভরসা করছেন, অর্থাৎ ডাক্তার না দেখিয়ে নিজের চিকিৎসা নিজেই করছেন। আবার সরকারি হাসপাতালে শুরু করা চিকিৎসার ক্ষেত্রেও প্রায় ৪০ শতাংশকে বাইরে থেকে ওষুধ বা পরীক্ষা করাতে হয়েছে।

    গবেষকদের মতে, উচ্চ কভারেজ মানেই আর্থিক সুরক্ষা নয়। বিমা প্রকল্প কার্যকর করতে হলে তার ব্যবহারযোগ্যতা, পরিষেবার সহজলভ্যতা প্রয়োজন। না হলে স্বাস্থ্যসাথীর মতো প্রকল্প থাকা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের খরচ কমবে না।

  • Link to this news (এই সময়)