নিপা ভাইরাসের আক্রান্তের ঘটনায় রাজ্যে সদ্য আতঙ্কের আবহ এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি কলকাতা তথা রাজ্যবাসী। তার মধ্যেই ঘটে গেছে এক মর্মান্তিক ঘটনা।
মৃত্যু হয়েছে বারাসাতে এক বেসরকারি হাসপাতালে স্বাস্থ্যকর্মী মহিলা নার্সের। যার কারনে নিপা ভাইরাসের আতঙ্ক কিছুটা হলেও বাড়িয়ে তুলেছিল।
কিন্তু চিকিৎসকদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা যায়, পেশায় নার্স ওই মহিলা নিপা সংক্রমণে আক্রান্ত হলেও পরবর্তীতে তাঁর শরীরে একাধিক আভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আক্রান্ত হয়।
যার মধ্যে মস্তিষ্ক এবং ফুসফুস গুরুতরভাবে আক্রান্ত হয়। তবে নিপা ভাইরাসে আক্রান্তের কারণে মৃত্যু হয়নি বলেই দাবি করে রাজ্যের স্বাস্থ্য দপ্তর।
মূলত নতুন বছরের শুরুতে নিপা ভাইরাসের কারণে দুজন স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হলেও, কয়েক দিনের মধ্যেই একজনকে ছেড়ে দেওয়া হয় সুস্থ করে।
কিন্তু এই মহিলা স্বাস্থ্যকর্মী নার্সের সুস্থ হয়ে ওঠার গতি ছিল অত্যন্ত মন্থর। পরবর্তীতে শারীরিকভাবে অবনতি দেখা যায়। আক্রান্ত হয়ে পড়ে একাধিক অভ্যন্তরীণ অঙ্গ। এর ফলে তাঁর মৃত্যু ঘটে।
তবে নিপা ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সফল হয়েছিল রাজ্য। দুজনের বেশি সংক্রমণের কোনও ঘটনা ধরা পড়েনি রাজ্যে। এমনটাই জানিয়েছিল রাজ্যে স্বাস্থ্য দপ্তর।
এবার তাই নিয়ে একই রকম ভাবে দরাজ সার্টিফিকেট দিল কেন্দ্র। সার্টিফিকেট দিলেন আইসিএমআর বর্তমানে নির্বি (NIRBI)- ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ রিসার্চ ইন ব্যাকটেরিয়া ইনফেকশনস্ এর সর্বভারতীয় প্রধান (DG) রাজেশ বেহল।
শনিবার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ রিসার্চ ইন ব্যাকটেরিয়া ইনফেকশনস-এর ডঃ দিলীপ মহলানবিশের আবক্ষ মূর্তি উন্মোচনে উপস্থিত থেকে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে চিকিৎসক রাজিব বেহল জানান, নিপা ভাইরাস নিয়ে রাজ্যে আতঙ্কের কোনও কারণ নেই।
তাঁর বক্তব্য, ‘নিপা ভাইরাস সাধারণত মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায় না, এটি মূলত বাদুড় থেকে মানুষের শরীরে সংক্রমিত হয়।’
রাজীব বেহেল জানান, ২০০৭ সালে পশ্চিমবঙ্গে নিপা সংক্রমণে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। পরে কেরালাতেও মাঝেমধ্যে এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা গিয়েছে। তবে এবার পশ্চিমবঙ্গে সম্ভাব্য সংক্রমণের পরিস্থিতি দ্রুত এবং দক্ষতার সঙ্গে সামাল দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘রাজ্যের স্বাস্থ্য দপ্তর সঠিক সময়ে যথাযথ ব্যবস্থা নিয়েছে। ফলে সংক্রমণ দু’জনের বেশি বাড়তে দেওয়া হয়নি। দ্রুত নজরদারি, আইসোলেশন এবং কন্ট্যাক্ট ট্রেসিংয়ের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল বলেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে।’
তিনি আরও জানান, বিষয়টি নিয়ে রাজ্যের প্রিন্সিপাল হেলথ সেক্রেটারি এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য আধিকারিকদের সঙ্গে তাঁর সরাসরি কথা হয়েছে। পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিশ্চিত করা হয়েছে।
রাজ্যে নজরদারি নিয়ে আইসিএমআর প্রধানের বক্তব্য, ‘বিভিন্ন রাজ্যের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গেও বাদুড়ের মধ্যে নিপা ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছে। তাই সতর্কতা শিথিল করার কোনও সুযোগ নেই। আমাদের সব সময় নজরদারি চালিয়ে যেতে হবে। ভাইরাস যাতে আর ছড়াতে না পারে, সে বিষয়ে কঠোরভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে।’
রাজীব বেহল জোর দিয়ে আরও বলেন, ‘আমরা কাউকে নিপার কারণে মৃত্যু হতে দেব না। দ্রুত শনাক্তকরণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমেই এই ভাইরাসকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।’
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বাদুড় থেকে ফল বা অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যের মাধ্যমে নিপা ভাইরাস মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। তাই কাঁচা ফল ভালো করে ধুয়ে খাওয়া, সন্দেহজনক উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাই এখন সবচেয়ে বড় প্রতিরোধের পথ।