• যে অন্ধকার ছুঁতে ভয় পায় অনেকে, সেই অন্ধকার ছুঁয়ে দেখেছে 'ওসিডি'
    আজকাল | ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • চলচ্চিত্র বিদ্যার ক্লাসে ছবিকে নতুন করে দেখতে শেখানো হয়। আর সেখানেই শিখেছিলাম, ইরানের ছবিকে নতুন করে দেখতে। শিশুচরিত্রকে কেন্দ্র করে কী করে দেশ-কালের নানা আলো-অন্ধকার তুলে আনতে হয়, সে বিষয়ে পারদর্শী সে দেশের পরিচালকরা। তাঁরা বিশ্ব চলচ্চিত্রকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন, শৈশবের চোখে দুনিয়াটা কেমন দেখতে লাগে। সৌকর্য ঘোষাল ক্রমে নিজের এক যাত্রাপথ তৈরি করছেন শৈশবের ক্যানভাসে। সেই সেই ক্যানভাস ছুঁয়ে থাকছে ছোটবেলা, দুনিয়ারির জন্মলগ্ন, যে লিটমাসে তিনি সময়কে যাচাই করতে চাইছেন বারংবার। আর সেই কারণেই তাঁর হাতে নবনির্মিত ছবি 'ওসিডি' নির্বিঘ্ন দৃশ্য়কল্পে আসলে খুঁচিয়ে তোলে অস্বস্তিকে, যে অস্বস্তি চিরন্তন। থ্রিলারের উপাদানের রোমহর্ষক উত্তেজনার বদলে আসলে এই ছবি অন্য একটা কাব্য রচনা করে, যেখানে থ্রিলারের প্রথাগত ছক ভেঙে ছবি বেরিয়ে যায় বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে।

    সৌকর্য ঘোষালের কৃৎকৌশল নিয়ে নতুন করে আলোচনা করার কিছু নেই। তিনি জানেন, কতটা করতে হয়, কতটা নয়। এই একই গল্প বাংলার অন্য কিছু জনপ্রিয় পরিচালকের হাতে পড়লে স্বপ্ন দৃশ্য-টিস্য করতে গিয়ে তাঁরা এমন ল্যাজেগোবরে হতেন, চারটি হাবিজাবি গানে স্লো-মোশন মুভমেন্ট রেখে এমন শনির পাঁচালি রচনা করতেন যে দেখে হাসি পেতো। সৌকর্য তেমন করেন না, করেননি কখনও। তিনি সমঝে কাজ করেন, বাড়াবাড়ি তাঁর ছবির অংশ কখনই নয়। সেই কারণেই তিনি এই সময়ের স্মার্ট পরিচালকদের মধ্যে অন্যতম। অন্তত অধুনা বাংলা সিনেমার স্লো-মোশন বাতিক থেকে তিনি যোজন দূরে। পাশাপাশি বলতে হবে, তাঁর চরিত্র বাছাইয়ের কথা। তিনি জয়া আহসানের সঙ্গে স্বচ্ছন্দ, কিন্তু শুধু জয়া কেন, কৌশিক সেন, কনীনিকা থেকে শুরু করে অনসূয়া মজুমদারের বাছাই নিঃসন্দেহে ছবিকে অন্যমাত্রা দিয়েছে।

    ছবিতে অনবদ্য অভিনয় করেছে আর্শিয়া মুখার্জি। সে পর্দায় অভিজ্ঞ, কিন্তু এমন সিরিয়াস ছবি করতে হলে একটা পরিণতি লাগে, অভিনয়ের তারকে বাঁধতে হয় বাকিদের সঙ্গে। পরিচালক সে কাজ করিয়ে নিয়ে পেরেছেন আর্শিয়াকে দিয়ে। জয়া আহসান, কৌশিক সেন ও অনসূয়া মজুমদারের কথাও আলাদা করে উল্লেখ করতে হয় এই ছবির ক্ষেত্রে। ছবি নিস্তরঙ্গ অথচ অন্ধকার এক গতিপথের সঙ্গে তাঁদের নিয়ন্ত্রিত অভিনয় যেন অবিচ্ছেদ্য মনে হয়েছে। মনে হয়েছে এরা ছাড়া এই চরিত্র আর কেউ করতে পারতেন না। অনবদ্য অভিনয় করেছেন বাংলা ছবির সাম্প্রতিক বিষ্ময় শ্রেয়া ভট্টাচার্য। অভিনেতাদের দল এখানে অত্যাধিক শক্তিশালী। তাঁরা সৌকর্যর ছবির ভাষাকে বুঝেছেন। সেই ভাষার সঙ্গে একসঙ্গে, এক সন্ধ্যায় এসে বসেছেন। না হলে এমন অভিনয় উপহার দেওয়া সম্ভব নয়। যে কথা দিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা, এখানে সেই প্রসঙ্গ না এনে পারা যাচ্ছে না। আসলে রিয়ালিজমকে দেখাতে গিয়ে যেভাবে ইরানের পরিচালকরা জীবনকে ধরেছিলেন, সেখানেও কোথাও কোথাও এই নিস্তরঙ্গ আদলের খোঁজ মেলে। সৌকর্য যে শহরকে দেখিয়েছেন, যেভাবে দেখিয়েছেন, যে অ্যাসাইলাম দেখিয়েছেন, যেভাবে তাঁদের মধ্যে কথা বলিয়েছেন, সেখানে বাংলা থ্রিলারের আদত গত থেকে তিনি বেরিয়ে এসেছেন। বাংলা বাজারের থ্রিলার পরিচালকরা ভাবতে পারেন, গোটা একটা থ্রিলার ছবিতে একটা তেমন-তেমন চেজ সিকোয়েন্স নেই, শুরুর ওই ফোন চুরির ঘটনা ছাড়া (যদিও সেটাও নির্লিপ্ত একটা চেজিং)। আস্ত একটা থ্রিলার এসব চাটমশলা ছাড়াই যে সৌকর্য বানিয়েছেন, তার জন্য ওঁকে আলাদা করে ধন্যবাদ দিতে হয়। মুক্তির স্বাদ দেওয়ার জন্য একটা আলাদা প্রাইজও তিনি পেতে পারেন।

    ছবির গল্পের ক্ষেত্রেও তাঁর মাথায় জগদীশ গুপ্তের মতো গল্পকারদের একটা ছায়া কোথাও যেন দেখতে পাওয়া যায়। উত্তরসূরী তো, কোথাও মাণিক, তারাশঙ্কর, জগদীশরা রয়ে গিয়েছেন তাই। তিনি চাইল্ড অ্যাবিউসের ঘটনা ও তার পর্যায় পরম্পরায় ঘটে চলে ঘটনাকে শুধু ঘটনা হিসাবে দেখাতে চাননি, তিনি একটা দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে চেয়েছেন ছবিতে। যে কারণে ছবির আদত কাঠামোটায় একটা আলোয় চাপা অন্ধকার আছে। যে অন্ধকার ছুঁতে ভয় পায় অনেকে, সেই অন্ধকার ছুঁয়ে দেখতে চেয়েছেন সৌকর্য। আর সেই আঁধারের আলোতে দর্শককে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। আর সেই কারণেই বোধহয় তিনি এই সময়ের চেনা ছক থেকে নিজেকে বার করতে পেরেছেন।
  • Link to this news (আজকাল)