• শিবরাত্রিতে ‘আপনা ঘর’–এর আবাসিকদের সঙ্গে আনন্দে মাতেন তসলিনও
    এই সময় | ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • প্রশান্ত পাল, পুরুলিয়া

    শিবঠাকুরের বিয়ে। এই দিনে তাঁরা সবাই শিবঠাকুরের আপন দেশের বাসিন্দা। ভোলেবাবার বিয়ের দিনটির দিকে তাঁরা বছরভর সাগ্রহে চেয়ে থাকেন।

    তাঁরা মানে পুরুলিয়া শহরের ভবঘুরেদের ঠিকানা ‘আপনা ঘর’–এর আবাসিকরা, একদিন যাঁদের প্রায় সবারই ঠিকানা ছিল ফুটপাথ। কেউ অসুস্থ অবস্থায় পড়েছিলেন পথের ধরে, কেউ বা উদ্দেশ্যহীন ভাবে ঘুরে বেড়াতেন রাস্তায় রাস্তায়। চেয়েচিন্তেই গ্রাসাচ্ছাদন চলত। রাস্তা থেকে উদ্ধার করে পুলিশই এই আবাসিকদের ‘আপনা ঘর’–এ পৌঁছে দিয়েছে। সেই থেকে নতুন ঠিকানায় চলছে ভবঘুরেদের নতুন জীবন। পরে ঠিকানা মিললে কেউ ঘরে ফেরেন, কেউ বা বছরের পর বছর ধরে রয়েছেন এখানেই।

    তাঁদেরই একজন তসলিন জহরিনা। শিবরাত্রির দিনটি অন্যদের মতোই তাঁর কাছেও একই ভাবে আনন্দের। আশ্রম কর্তৃপক্ষ আবাসিকদের জন্য ফি বছরই শিবরাত্রির আয়োজন করেন। উপবাস রেখে এ দিন শিবঠাকুরের অভিষেকে অংশ নেন আবাসিকরা। ‘আপনা ঘর’–এর সদস্য সত্যদাস কুণ্ডু বললেন, ‘শুধু কি অভিষেকে অংশ নেওয়া! সন্ধ্যায় আশ্রম প্রাঙ্গণ থেকে বেরোনো শিবঠাকুরের বিয়ের বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রাতেও সানন্দে অন্য আবাসিকদের সঙ্গে অংশ নিয়েছেন তসলিন। থেকেছেন বিয়ের আসরেও।’

    ‘আপনা ঘর’–এর মুখপাত্র সুজিত সুলতানিয়া জানালেন, পুরুলিয়া-বাঁকুড়া জাতীয় সড়কের পাশে পুরুলিয়া মফস​্সল থানা এলাকার একটি জায়গায় পথের ধারে পড়েছিলেন তসলিন। ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে পুলিশ এখানে পৌঁছে দিয়ে গিয়েছিল তাঁকে। তিনি আরও বললেন, ‘প্রথমে তো কিছুই বলত না। পরবর্তী সময়ে কাউন্সেলিংয়ে জানা যায়, দেরাদুনে দিদির বাড়ি বেড়াতে গিয়ে হারিয়ে যায়। আমরা ওর বাড়ির একটা ঠিকানা খুঁজে পেয়েছি। চেষ্টা চলছে ওকে বাড়ি ফেরানোর।’

    তসলিনকে নিয়ে যখন এই সব কথা হচ্ছে, তখন তিনি শিবঠাকুরের অভিষেক পর্বে সঙ্গিনী আবাসিকদের সঙ্গে তন্ময় হয়ে বসে রয়েছেন। কপালে চন্দনের প্রলেপ লাগিয়ে হাত জোড় করে দেবতাকে প্রণাম নিবেদনে ব্যস্ত তিনি। তসলিন বললেন, ‘এই দিনটা আমাদের সবার কাছেই অনেক আনন্দের। রোজকার একঘেঁয়ে জীবনের মাঝে একটা অন্য রকম দিন কাটানো। সবার সঙ্গে দেখা হওয়া, দিনভর আনন্দ করা।’ কৃষ্ণা দাস নামে অন্য এক আবাসিকও বললেন, ‘এই দিনটা আমাদের সবার কাছে অন্য রকম। এত আনন্দের যে, বলে বোঝানো যাবে না।’ হবেই বা না কেন! শিবের বিয়ে মানে তো দুপুর থেকে রাত, কব্জি ডুবিয়ে ভুরিভোজনের আয়োজন।

    সুজিত আরও বললেন, ‘রেলশহর আদ্রা থেকে একজনকে উদ্ধার করে নিয়ে এসেছিলাম। রাস্তার পাশে পা ভেঙে পড়েছিল। শরীরে চর্মরোগও বাসা বেঁধেছিল। তুলে নিয়ে আসার পরে দীর্ঘদিন সেই ব্যক্তির চিকিৎসা চলে। ভাঙা পায়ে অস্ত্রোপচারও করানো হয়।’ তিনি কোথায়? প্রশ্ন করতেই সুজিত বললেন, ‘পরে জানতে পারি, ওর নাম মোক্তার। বাড়ি ছিল রাজস্থানের একটি গ্রামে। সুস্থ করে ওকে আমরা বাড়িতে ফিরিয়ে দিয়েছি। ফিরে যাওয়ার সময়ে মোক্তার বলেছিল, আল্লা ও ঈশ্বরকে ধন্যবাদ। তাঁদের অস্তিত্ব না থাকলে আমি বোধহয় কোনও দিনই বাড়ির প্রিয়জনদের মুখ দেখতে পেতাম না।’ সুজিত বললেন, ‘মোক্তারও এই ধরনের উৎসবগুলিতে এ ভাবেই অংশ নিত। মানবতার সেবাই আমাদের আশ্রমের মূলমন্ত্র। এখানে কে কোন ধর্মের, সেটা বড় কথা নয়। উৎসবের অঙ্গনে আনন্দই প্রধান।’

  • Link to this news (এই সময়)