• কেরালার শবরীমালা মন্দির: কেন সুপ্রিম কোর্টের ৯ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চে এই মামলার শুনানি?
    এই সময় | ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • শমীক ঘোষ, এই সময় অনলাইন

    ২০১৮ সালে শীর্ষ আদালতের পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ জানিয়েছিল, কেরালার বিখ্যাত শবরীমালা মন্দিরে (Kerala Sabarimala Temple ) সব বয়সের মহিলারা যেতে পারবেন। ওই রায় পুনরায় খতিয়ে দেখার আবেদন জানিয়ে ৬৭টি মামলা হয়। সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি বিপুল এম পঞ্চোলির বেঞ্চ জানিয়েছে, ৭ এপ্রিল সকাল সাড়ে ১০টায় শুনানি শুরু হবে। শুনানি শেষ হবে ২২ এপ্রিল।

    আইনজীবীদের একাংশের মতে, সুপ্রিম কোর্টের এতজন বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চে (Constitution Bench) কোনও মামলার নিষ্পত্তি হওয়া বিরল ঘটনা। কারণ, সংবিধানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে পর্যালোচনার প্রয়োজন হলে তবেই এত জন বিচারপতি নিযুক্ত হন। সংবিধানের ১৪৫ (৩) ধারায় বলা রয়েছে, গুরুতর আইনি প্রশ্ন উঠলে এবং একই সঙ্গে সংবিধানের ব্যাখ্যার দরকার হলে সুপ্রিম কোর্টের অন্তত পাঁচ জন বিচারপতিকে নিয়ে সাংবিধানিক বেঞ্চ গঠন করতে হবে। যখন দেশের প্রশাসনিক কাঠামো প্রভাবিত হওয়ার অথবা দেশের আপামর বাসিন্দার কোনও মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের সম্ভাবনা থাকে, কেবল তখনই নয় জন বিচারপতিকে নিয়ে পৃথক বেঞ্চ গড়া হয়ে থাকে।

    সুপ্রিম কোর্টের বিচার পদ্ধতির কাঠামো হলো: ডিভিশন বেঞ্চ বা দুই বিচারপতির বেঞ্চ, তিন বিচারপতির বেঞ্চ, পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ, সাত বিচারপতি বেঞ্চ, নয় বিচারপতির বেঞ্চ। যখন সাত বিচারপতির কোনও রায় পুনরায় বিবেচনা করে দেখার দরকার পড়ে, তখন নয় বিচারপতি তা বিবেচনা করে দেখেন।

    আইনজীবীরা জানিয়েছেন, প্রথমত, সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতির সংখ্যা ৩৪ (প্রধান বিচারপতি-সহ)। তার বেশি নয়। নয় বিচারপতিকে নিয়ে আলাদা সাংবিধানিক বেঞ্চ তৈরি করার অর্থ হলো, মোট বিচারপতির সংখ্যার প্রায় এক তৃতীয়াংশ বিচারপতিকে কেবলমাত্র একটি মামলার জন্য কিছুদিন অন্য কোনও কাজে ব্যস্ত না রাখা। তাই প্রধান বিচারপতিকে এই নিয়োগ করতে হয় অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে। কারণ তিনি সুপ্রিম কোর্টের মাস্টার রোস্টার অর্থাৎ, কোন কোন বা কী ধরনের মামলা কোন কোন বিচারপতি শুনবেন, তা তিনিই করে থাকেন।

    দ্বিতীয়ত, সুপ্রিম কোর্ট সাধারণত অনেক বড় বেঞ্চ তৈরি করতে চায় না, যদি না চূড়ান্ত দরকার পড়ে। কারণ, বেঞ্চ যত বড় হবে, মতৈক্য তত কম হবে। রায় নিয়ে বিচারপতিদের মতামত দ্বিধাবিভক্ত বা তার চেয়ে বেশি হলে আইনি স্বচ্ছতা কমে যেতে পারে।

    ১৩ জন বিচারপতির বেঞ্চ (এখনও পর্যন্ত সব চেয়ে বড়): কেশবানন্দ ভারতী বনাম কেরালা রাজ্য (১৯৭৩)। এই মামলায় নির্ধারিত হয়েছিল সংবিধান সংশোধনের অধিকার সংসদের রয়েছে। কিন্তু সেই সংশোধন করতে হবে সংবিধানের মূল কাঠামো অপরিবর্তিত রেখে। সুপ্রিম কোর্টের ইতিহাসে এত বড় গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক রায় এর আগে বা তার পরে এখনও পর্যন্ত হয়নি।

    কেবল সব বয়সি মহিলার মন্দিরে প্রবেশাধিকারের জন্য নয়, এই মামলা সাংবিধানিক বিতর্ককে আরও গভীরে নিয়ে গিয়েছে। ধর্মীয় স্বাধীনতার ভিত্তি নিয়েই যখন প্রশ্ন উঠেছে, তখন নয় বিচারপতিই তার মীমাংসা করবেন।

    ২০১৮ সালে সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ রায় দিয়েছিল, কেবল ১০-৫০ বছর বয়সি মহিলারা নন, যে কোনও বয়সের মহিলা ওই মন্দিরে ঢুকতে পারবেন। কিন্তু সেই রায় পুরনায় বিবেচনার আর্জি যাঁরা জানিয়েছেন, তাঁরা আরও বড় সাংবিধানিক প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন।

    আইনজীবীদের মতে, ১৯৫০ সাল থেকে এখনও পর্যন্ত 'essential religious practices'-এর প্রশ্নে আদালত প্রাধান্য দিয়েছে, ওই ধরনের ধর্মীয় আচার পালন সাংবিধানিক অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করেছে কি না, তাকে গুরুত্ব দিতে বা তার বিচার করতে। নয় বিচারপতির বেঞ্চ দেখবে, কোনও আচার পালন জরুরি কি না এবং এই ধরনের জরুরি ধর্মীয় বিষয়ে বিচার করার এক্তিয়ার আদালতের কতদূর রয়েছে। এই মামলায় রায় কেবল শবরীমালা মন্দিরের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে না। মসজিদ, চার্চ, গুরুদ্বার বা হিন্দুদের অন্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হবে বলে মনে করছেন আইনজীবীদের একাংশ।

  • Link to this news (এই সময়)