অর্ণবাংশু নিয়োগী: ভোটের মুখে বিড়ম্বনায় সোহম: ৬৮ লক্ষ টাকা তছরুপ ও হুমকির অভিযোগে মামলা দায়ের
রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের দামামা বাজার আগেই বড়সড় আইনি জটিলতায় জড়ালেন চণ্ডীপুরের অভিনেতা-বিধায়ক সোহম চক্রবর্তী। ছবি তৈরির জন্য নেওয়া লক্ষ লক্ষ টাকা ফেরত না দেওয়া এবং উল্টে পাওনাদারকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগে নাম জড়িয়েছে তাঁর। এই ঘটনায় অভিনেতা-রাজনীতিবিদ শাহিদ ইমামের অভিযোগের ভিত্তিতে এখন সরগরম টলিউড থেকে রাজনৈতিক মহল।
ঘটনার সূত্রপাত: ‘পাকা দেখা’ ও ৬৮ লক্ষের অঙ্ক
অভিযোগকারী শাহিদ ইমাম, যিনি অভিনয় জগতে ‘শুভম’ নামে পরিচিত, তিনি জানিয়েছেন সোহমের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের পরিচয়। ২০২১ সালে সোহম চক্রবর্তীর প্রযোজনায় ‘পাকা দেখা’ ছবিটির জন্য তিনি ৬৮ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন। শাহিদের দাবি, সেই সময় তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের যুবনেতা হিসেবেও সক্রিয় ছিলেন। তবে পরবর্তীতে নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় (SSC Scam) সিবিআই-এর হাতে গ্রেফতার হয়ে তিনি জেলবন্দি হন। ২০২৩ সালে জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর থেকেই তিনি সোহমের কাছে নিজের পাওনা টাকা ফেরত চাইতে শুরু করেন।
আর্থিক লেনদেন ও বর্তমান বিবাদ
শাহিদ ইমামের দাবি অনুযায়ী, ৬৮ লক্ষ টাকার ঋণের মধ্যে সোহম দুই দফায় মাত্র ২৫ লক্ষ টাকা ফেরত দিয়েছেন। বাকি ৪৩ লক্ষ টাকা এবং তার সুদ চাইলে বিধায়ক তা দিতে অস্বীকার করেন। শাহিদের অভিযোগ:
১. বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও বাকি টাকা মেটানো হয়নি।
২. টাকা ফেরত চাইলে সোহমের সহকারী দেখা করে তাঁকে ভয় দেখান ও হুমকি দেন।
৩. জেল থেকে ফেরার পর থেকে পাওনা টাকা আদায়ে তিনি কার্যত নাজেহাল হচ্ছেন।
পুলিসি ‘নিষ্ক্রিয়তা’ ও আইনি পদক্ষেপ
মামলাকারীর অভিযোগ, প্রথমে তিনি দক্ষিণ কলকাতার চারু মার্কেট থানায় লিখিত অভিযোগ জানাতে গেলেও পুলিশ তাতে কর্ণপাত করেনি। পুলিশের এই ‘নিষ্ক্রিয়তা’র বিরুদ্ধে তিনি উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হন এবং মামলা দায়ের করেন।
মঙ্গলবার আদালতে মামলার কপি জমা পড়ার পরেই নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। সূত্রের খবর, এরপরই চারু মার্কেট থানার পক্ষ থেকে শাহিদকে ফোন করে অভিযোগ নেওয়ার বিষয়ে তৎপরতা দেখানো হয়। বর্তমানে পুলিশ সোহম চক্রবর্তী ও তাঁর সহকারীর বিরুদ্ধে ওঠা হুমকির অভিযোগ খতিয়ে দেখছে।
সোহম চক্রবর্তীর বয়ান: ‘রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র’
এই সমস্ত অভিযোগের প্রেক্ষিতে সোহম চক্রবর্তী ঋণ নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে নিয়েছেন, তবে হুমকির বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন। তাঁর পাল্টা দাবি:
শাহিদের ৬৮ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করার কথা থাকলেও তিনি মাঝপথে টাকা দেওয়া বন্ধ করে দেন। এর ফলে ছবির কাজ শেষ করতে সোহমকে অন্য জায়গা থেকে চড়া সুদে টাকা ধার করতে হয়েছিল।
সোহম জানিয়েছেন, “বাংলা ছবির ব্যবসার অবস্থা এখন খুব একটা ভালো নয়। ছবির স্বত্ব বিক্রি হতে সময় লাগছে। আমি শাহিদকে বলেছি টাকা মিটিয়ে দেব, কিন্তু তার জন্য কিছুটা সময় প্রয়োজন।”
সামনেই বিধানসভা নির্বাচন, তাই এই সময়ে পুরনো কাসুন্দি ঘেঁটে তাঁর সম্মানহানি করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে দাবি সোহমের। একে তিনি ‘রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র’ হিসেবেই দেখছেন।
শাহিদের অবস্থান ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ
অন্যদিকে, শাহিদ ইমাম স্পষ্ট জানিয়েছেন যে তিনি আইনি লড়াই থেকে পিছিয়ে আসবেন না। তাঁর আইনজীবী ইতিমধ্যেই আদালতের সামনে সমস্ত নথিপত্র পেশ করেছেন। শাহিদের দাবি, তিনি একসময় শাসকদলের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও বর্তমানে ন্যায়বিচারই তাঁর একমাত্র লক্ষ্য।
নির্বাচনের প্রাক্কালে শাসকদলের এক তারকা বিধায়কের বিরুদ্ধে এহেন আর্থিক কেলেঙ্কারি ও হুমকির অভিযোগ বিরোধীদের হাতে নতুন অস্ত্র তুলে দিল বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। একদিকে সোহম যখন একে ‘কালিমালিপ্ত করার চেষ্টা’ বলছেন, অন্যদিকে শাহিদ তাঁর পাওনা আদায়ের দাবিতে অনড়। চারু মার্কেট থানার তদন্ত এবং আদালতের পরবর্তী পদক্ষেপই বলে দেবে এই ‘পাকা দেখা’ বিবাদের শেষ পরিণতি কী হতে চলেছে।