ভেনিসে এক কাপ কফি ও আজীবনের স্মৃতি, অস্কারজয়ী রবার্ট ডুভালের মৃত্যুতে স্মৃতিমেদুর অঞ্জন
আজকাল | ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
হলিউডের ইতিহাসে যে ক’জন অভিনেতা অভিনয়ের সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছেন, তাঁদের অন্যতম ছিলেন অস্কারজয়ী অভিনেতা রবার্ট ডুভাল। দীর্ঘ ছয় দশকের অভিনয়জীবন শেষে রবিবার নিজের ভার্জিনিয়ার মিডলবার্গের বাড়িতে শান্তিপূর্ণভাবে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন তিনি। বয়স হয়েছিল ৯৫।
স্ত্রী লুসিয়ানা এক বিবৃতিতে জানান, বিশ্ব তাঁকে অস্কারজয়ী অভিনেতা, পরিচালক ও গল্পকার হিসেবে চিনলেও তাঁর কাছে ডুভাল ছিলেন “সবকিছু”। ডুভালের প্রয়াণে শোকপ্রকাশ করেছেন তাঁর বন্ধু তোহা বিশ্বখ্যাত আরেক অস্কারজয়ী অভিনেতা আল পাচিনো। তিনি বলেন, ডুভালের সঙ্গে কাজ করা তাঁর জীবনের অন্যতম সম্মানের মুহূর্ত। “তিনি জন্মগত অভিনেতা ছিলেন। নিজের অভিনীত চরিত্রের সঙ্গে তাঁর বোঝাপড়া এবং অসাধারণ প্রতিভা চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে,” জানান পাচিনো।
পরিচালক ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলা-ও তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে বলেন, ডুভাল ছিলেন তাঁর প্রযোজনা সংস্থা আমেরিকান জোয়েট্রোপের শুরু থেকেই এক অপরিহার্য অংশ। তাঁর চলে যাওয়া চলচ্চিত্রজগতের জন্য বড় ধাক্কা।
ডুভাল সর্বাধিক পরিচিত ছিলেন কঠোর, খানিক জটিল অথচ দৃঢ়চরিত্রের ভূমিকাগুলির জন্য। দ্য গডফাদার ও দ্য গডফাদারপার্ট টু-তে মাফিয়া কনসিলিয়ের চরিত্রে তাঁর অভিনয় আজও সিনেমাপ্রেমীদের মনে অম্লান। একইভাবে অ্যাপোক্যালিপ্স নাও-এ তাঁর সংক্ষিপ্ত উপস্থিতি ও বিখ্যাত সংলাপ — “আই লভ দ্য স্মেল অফ দ্য ন্যাপলম ইন দ্য মর্নিং” চলচ্চিত্র ইতিহাসে কিংবদন্তি সংলাপের মর্যাদা পেয়েছে।
সাতবার অস্কারের জন্য মনোনীত হওয়া ডুভাল ১৯৮৩ সালে সেরা অভিনেতার পুরস্কার জেতেন টেন্ডার মার্সিস-এ এক ভগ্নপ্রায় কান্ট্রি সিঙ্গারের চরিত্রে অভিনয়ের জন্য। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজের তালিকায় রয়েছে নেটওয়ার্ক, দ্য গ্রেট স্যানিটিনি, দ্য হ্যানমেইড'স টেইলএবং দ্য জাজ।
তবে নিজে সবচেয়ে প্রিয় চরিত্র হিসেবে উল্লেখ করতেন টেক্সাস রেঞ্জার থেকে কাউবয় হয়ে ওঠা অগাস্টাস ম্যাকক্রেকে, যেটি তিনি করেছিলেন টিভি মিনিসিরিজ লোনসাম ডাভ-এ।ডুভালের সিনেমা-জীবনের সূচনা হয়েছিল ১৯৬৩ সালে টু কিল আ মকিংবার্ড-এর চলচ্চিত্র সংস্করণে, যেখানে তিনি অভিনয় করেছিলেন নিভৃতচারী বু র্যা ডলির ভূমিকায়।
প্রসঙ্গত, ভারতের চলচ্চিত্রমহলেও তাঁর প্রভাব গভীর। জনপ্রিয় বাঙালি অভিনেতা-পরিচালক অঞ্জন দত্ত স্মৃতিচারণ করে জানান, ১৯৮১ সালের ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে তরুণ বয়সে প্রথম দেখা হয়েছিল ডুভালের সঙ্গে। এক কাপ কফি খাইয়ে তিনি যে উষ্ণতা দেখিয়েছিলেন, তা আজও ভোলেননি দত্ত। তাঁর ভাষায়, “তিনি ছিলেন অত্যন্ত সংবেদনশীল ও শক্তিশালী অভিনেতা। বাহ্যিক দৃঢ়তার আড়ালেও তাঁর চরিত্রে ছিল এক দুর্লভ কোমলতা।” জীবনের প্রথম আন্তর্জাতিক উৎসবে প্রথম বড় স্বীকৃতি পাওয়ার আবহেই এক ক্যাফেতে অঞ্জনের দেখা হয়ে যায় রবার্ট ডুভালের সঙ্গে। এরপর ডুভাল নিজেই তাঁকে কফি খাওয়ান। হাসিমুখে প্রশংসা করে বলেন, “তোমার মধ্যেও কিন্তু কিছু ব্যাপার আছে...”
সেবার অঞ্জন পেয়েছিলেন প্রথম আন্তর্জাতিক পুরস্কার। মৃণাল সেন পরিচালিত চালচিত্র ছবির জন্য ‘মেডেন পারফরম্যান্স আলিতালিয়া অ্যাওয়ার্ড’। অন্যদিকে ডুভাল এসেছিলেন ট্রু কনফেশনস ছবির জন্য, পরিচালক উলু গ্রসবার্ড। সেই ছবির জন্য তিনি যৌথভাবে সেরা অভিনেতার পুরস্কার ভাগ করে নেন রবার্ট ডি নিরো-র সঙ্গে।
রবার্ট ডুভালের অভিনয় ছিল নিঃশব্দ অথচ প্রবল। তিনি কখনও প্রদর্শনমূলক বরফট্টাইয়ে বিশ্বাসী ছিলেন না, বরং চরিত্রের ভিতরে ঢুকে সেটিকে জীবন্ত করে তুলতেন। তাই তাঁর প্রস্থান শুধু একজন অভিনেতার মৃত্যু নয়, এক অভিনয়যুগের অবসান।
চলচ্চিত্রপ্রেমীদের হৃদয়ে তিনি বেঁচে থাকবেন তাঁর চরিত্রগুলোর মধ্যেই।