তথাকথিত শ্রেণিতন্ত্রের পর্দা সরিয়ে অন্য বাংলার দিকে তাকাতে বাধ্য করে ‘অদম্য’
প্রতিদিন | ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বিদিশা চট্টোপাধ্যায়
বাংলা ছবির দৃশ্যকল্প বহুকাল থেকেই এক ধাঁচের হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাধারণত যে আর্থসামাজিক বর্গকে তুলে ধরা হয় অর্থাৎ রুচিশীল ইন্টেলেকচুয়াল বাঙালি তাঁদের ড্রইং রুম, বেড রুম, পর্দার প্রিন্ট, আলোচনার বিষয়, পারস্পরিক সমীকরণ বা ক্রাইসিসের খুব একটা পরিবর্তন দেখিনি অনেকদিন। ঋতুপর্ণ ঘোষ একটা স্ট্যান্ডার্ড সেট করে দিয়েছিলেন, সেটারই খানিক এদিক আর ওদিক, কপি হতে-হতে সিনেমায় বাঙালির সত্যি চেহারাটা ভুলতে বসেছি ক্রমশ। মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত, খুব ধনী, যে কোনও শ্রেণিরই স্টিরিওটাইপ তৈরি করে দিয়েছে বর্তমান বাংলা সিনেমা। এমন একটা সময়ে রঞ্জন ঘোষ পরিচালিত ‘অদম্য’ যেন দমকা হাওয়া। এক ঝটকায় ফ্যাব ইন্ডিয়াসুলভ নান্দনিক পর্দা সরিয়ে দিয়ে আরেক বাংলার দিকে তাকাতে বাধ্য করে। মুহূর্তে বাংলা ছবির চেনা সেটআপ বদলে যায়। শহুরে দর্শক সন্দিহান হয়ে পা রাখে অচেনা পরিসরে। আমরা দেখি একলা ছেলে হাঁটছে সেই পথে। তার নাম পলাশ (অভিনয়ে আরিয়ুন ঘোষ)। সে একা কেন? আর কেনই বা সে শহর ছেড়ে দূরে চলে যাচ্ছে ক্রমশ? আধুনিক জীবন, সভ্যতা, সমাজ, সবকিছু ছেড়ে সে শহর থেকে গ্রাম, গ্রাম থেকে জঙ্গল, জঙ্গল থেকে জমির শেষ প্রান্ত–সমুদ্রতীরে এসে দাঁড়িয়েছে। মনে পড়ে যায় সেই ক্রমাগত স্কুল পালানো, কারেকশনাল হোম থেকে পালানো ‘অ্যান্তোয়েন ডইনেল’-এর (দ্য ফোর হান্ড্রেড ব্লো’জ, ১৯৫৯) কথা।
সময় পালটেছে, পৃথিবী পালটেছে কিন্তু সমাজচ্যুত হয়ে অন্য পথে হাঁটার তাগিদ এবং কারণ এখনও জিইয়ে আছে। তাদের আমরা কখনও দলছুট, কখনও অ্যান্টিন্যাশনাল, কখনও বিপ্লবী, কখনও আইন অমান্যকারী, কখনও দাগি আসামিও বলে থাকি। রাষ্ট্র, সমাজ তাদের মেনে নেয় না। তাদের অনেকেই চিরতরে হারিয়ে যায় নাজিব আহমেদের (১৬ অক্টোবর, ২০১৬ সালে জে.এন.ইউ থেকে নিখোঁজ) মতো অথবা গৌরী লঙ্কেশের মতো। রঞ্জনের ছবিতে পলাশেরও ঠাঁই নেই এই সমাজে। সে রাষ্ট্রের বিরোধিতা করেছে, পুলিশ তার পিছনে ফেউয়ের মতো লেগে আছে। তাঁকে নিয়েই গোটা ছবি। গ্রাম থেকে গ্রামাঞ্চলে তার একা যাপন। একেবারে ন্যূনতম উপাদানে তার প্রতিদিনের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের গল্প বলে ‘অদম্য’। সেই গ্রামের চায়ের দোকানের ছোট্ট ছেলে কিংবা জেলেদের বেঁচে থাকা দেখি পলাশের চোখ দিয়ে। জল, জঙ্গল, জমিনের ছবি উঠে আসে। বাংলা ছবিতে এমন দৃশ্য দেখেছি বলে মনে পড়ে না।