মৌমিতা চক্রবর্তী: বাংলার ছাত্র রাজনীতিতে গত কয়েকদিন ধরে যে নামটি সবথেকে বেশি চর্চিত, তিনি হলেন প্রতীক উর রহমান। সিপিআই(এম)-এর রাজ্য কমিটি থেকে তাঁর পদত্যাগের পর থেকেই জল্পনা শুরু হয়েছিল— তবে কি প্রতীক উরের পরবর্তী গন্তব্য তৃণমূল? সম্প্রতি এক খোলামেলা সাক্ষাৎকারে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান, দলের অন্দরের ‘ষড়যন্ত্র’ এবং সৃজন ভট্টাচার্যের সঙ্গে তাঁর সমীকরণ নিয়ে মুখ খুললেন এই তরুণ নেতা।
অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ ও পাহাড়ের রূপক
নিজের মানসিক অবস্থা ও রাজনৈতিক অবস্থান বোঝাতে গিয়ে প্রতীক উর জীবনের পথকে একটি দুর্গম পাহাড়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেন, 'আমি এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছি যেখানে সামনে শুধু পাহাড়। পাহাড়ের চূড়ায় খাবার আছে নাকি মাটিতে ফুল আছে, আমি জানি না। তবে সেই পাহাড় না ডিঙোলে আমি পরবর্তী পথের হদিশ দিতে পারব না।' অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার গুরুত্ব বোঝাতে তিনি গাড়ির ‘লুকিং গ্লাস’-এর উদাহরণ দেন। তাঁর মতে, পেছনের ভুলগুলো না দেখলে সামনে বড় দুর্ঘটনার সম্ভাবনা থেকে যায়।
দলের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ: ‘গোপন তথ্য ফাঁস’
প্রতীক উর রহমানের প্রধান অভিযোগ তাঁর দীর্ঘদিনের সংগঠন সিপিআই(এম)-এর একটি বিশেষ অংশের বিরুদ্ধে। তিনি অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে জানান যে, দলের অত্যন্ত গোপন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের কথাবার্তা এবং বিমান বসুর সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্য ২০ মিনিটের মধ্যে সংবাদমাধ্যমে ফাঁস করে দেওয়া হচ্ছে।
প্রতীক উরের প্রশ্ন, 'যে বাড়িতে (দলে) কথা বললে তা ২০ মিনিটের মধ্যে বাজারে চলে আসে, সেই বাড়িতে আমি কী ভাবে কথা বলব?' তিনি দাবি করেন, দলের ভেতরেই কিছু ‘অপরাধী’ বসে আছে যারা তাঁর লড়াইকে কালিমালিপ্ত করার চেষ্টা করছে। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন যে, যারা এই তথ্য পাচার করছে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না, অথচ তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হলো।
সৃজন ভট্টাচার্য ও ‘একই ফ্রেমে’ থাকার জল্পনা
সাক্ষাৎকারে উঠে আসে SFI- এর রাজ্য সম্পাদক সৃজন ভট্টাচার্যের নামও। রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন ছিল, প্রতীক ও সৃজন— এই দুই বন্ধুকে কি একই ছকে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে? প্রতীক উর অবশ্য এই বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক।
তিনি জানান, সৃজনের নাম এই বিতর্কে জড়ানোর কথা তিনি প্রথমবার শুনছেন। তবে সৃজন ও তাঁর দীর্ঘদিনের কাজের সম্পর্ক এবং বন্ধুত্বকে তিনি অস্বীকার করেননি। তাঁর মতে, দীর্ঘ সময় একসাথে কাজ করলে মানুষ তাঁদের ‘একই ফ্রেমে’ দেখবেই, তবে তার রাজনৈতিক সমীকরণ সবসময় এক নাও হতে পারে।
তৃণমূল যোগ ও দলাদলির প্রসঙ্গ
তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেওয়া বা অন্য কোনও দলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা নিয়ে সরাসরি কোনও উত্তর না দিলেও প্রতীক উরের কথায় ছিল এক ধরণের প্রচ্ছন্ন অভিমান। তিনি জানান, বর্তমানে তাঁর কাছে কোনও দলে ফেরার বা কথা বলার ‘অনুমতি’ নেই। বিশেষ করে রাজ্য নেতৃত্বের একাংশের প্রতি তাঁর অভিযোগের আঙুল বেশ স্পষ্ট। তিনি মনে করেন, দলের ভেতরে তাঁর মতামতের কোনও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না।
‘লুকিং গ্লাস’ ও আত্মসমীক্ষা
প্রতীক বারবার করেছেন যে তিনি নিজেকে চিনতে বা দোষীদের চিহ্নিত করতে হয়তো ভুল করেছেন। তিনি বলেন, 'যদি আমি তাদের আগে চিনতে পারতাম, তবে আজ এই দিন দেখতে হতো না।' প্রযুক্তির এই যুগে তাঁর ফোন বা তাঁর গতিবিধি নিয়ে যে ধরণের কাটাছেঁড়া চলছে, তা নিয়েও তিনি বিরক্তি প্রকাশ করেন।
প্রতীক উর রহমানের এই বয়ান বাংলার বাম রাজনীতিতে কি বড়সড় ফাটলের ইঙ্গিত দিচ্ছে? ছাত্র রাজনীতি থেকে উঠে আসা একজন সম্ভাবনাময় নেতার এভাবে ‘বিদ্রোহী’ হয়ে ওঠা এবং দলের অন্দরের শৃঙ্খলার অভাব নিয়ে প্রশ্ন তোলা সিপিআই(এম)-এর জন্য অস্বস্তিকর।
প্রতীক উরের স্পষ্ট বক্তব্য:
১. তিনি দলের একটি বিশেষ অংশের (যাদের তিনি পেয়ারের লোক বা ‘কাছের লোক’ বলে ইঙ্গিত করেছেন) ওপর প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ।
২. তাঁর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘিত হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
৩. তিনি এখনই কোনও নতুন দলে যোগ দেওয়ার কথা ঘোষণা না করলেও, পুরনো ঘরে ফেরার পথও খুব একটা সহজ দেখছেন না।
প্রতীক উর রহমানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন সত্যিই সেই ধোঁয়াশায় ঢাকা পাহাড়ের মতো। তিনি কি একা লড়াই করবেন, নাকি তৃণমূলের মতো কোনো বড় শক্তিতে শামিল হবেন, তা সময়ই বলবে। তবে তাঁর এই সাক্ষাৎকার প্রমাণ করে দিল যে, বাম শিবিরের ভেতরে তরুণ তুর্কিদের মধ্যে অসন্তোষের যে আগুন জ্বলছে, তা নিভতে এখনও অনেক দেরি।