• প্রতীক উরের পর SFI সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক সৃজনও কি একই পথের পথিক? EXCLUSIVE...
    ২৪ ঘন্টা | ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • মৌমিতা চক্রবর্তী: পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে 'দলবদল' একটি অতি পরিচিত শব্দ। 

    এই মুহূর্তে রাজ্য-রাজনীতিতে অন্যতম বড় চর্চার কেন্দ্রে নবীন বামমেতা প্রতীক উর রহমান। সম্প্রতি তিনি সিপিআইএমের রাজ্যকমিটির সদস্যপদ এবং দল থেকে ইস্তফা দিয়েছেন! গত সোমবার ১৬ ফেব্রয়ারি সকালে রাজ্য রাজনীতিতে বজ্রপাতের মতো খবর আসে সিপিআইএম পার্টি থেকে প্রতীক উর রহমানের (Pratik Ur Rahaman) ইস্তফা!মিডিয়া হাউস থেকে নিজের দল, বিরোধী দল থেকে একের পর এক ফোন আসতে শুরু করে প্রতীক উরের কাছে।

    মুহূর্তে রটে যায়, তিনি তৃণমূলে যাচ্ছেন অথবা বিজেপিতে যাচ্ছেন। বিধানসভা ভোটের আর দু'মাসও বাকি নেই। SIR,বাজেট, ভোট, লক্ষ্মীর ভান্ডার, যুবসাথী-সব মিলিয়ে রাজ্য যখন উত্তাল, সিপিআইএমের শুন্য থেকে মহাশুন্যে বিলীন হয়ে যাওয়া তত্ব যখন আকাশে-বাতাসে ঘুরছে, কখনও হুমায়ুন কবীর কখনও নওশাদ সিদ্দিকির সঙ্গে বামেদের জোট নিয়ে সংবাদপত্রের প্রথম পাতা ভরে উঠছে- ঠিক তখনই লোকসভা ভোটে ডায়মন্ডহারবারে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্য়ায়ের বিরুদ্ধে তরুণ তুর্কি হিসেবে উঠে আসা মুখ, প্রাক্তন SFI রাজ্যনেতা, একটু ঘুরে দাঁড়ানোর আশায় বাঁচা সিপিএমের শেষ কয়েকটি সম্বলের একজন অন্যতম বড় ভরসা- প্রতীক উরের দলত্যাগ নিঃসন্দেহে উদ্বেগ বাড়িয়েছে সিপিএমের, এ কথা বলাই বাহুল্য। এবার ২৪ ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই আরও বড় চমক এল- আরও বড় ব্রেকিং নিউজ? কাস্তে-হাতুড়ি ছেড়ে ঘাসফুলে যাচ্ছেন এই তরুণ তুর্কি ? 

    আর এই আবহেই, প্রতীক উরের রাজনৈতিক যোদ্ধা, SFI-এর রাজ্য সম্পাদক, ২০২৪-এর লোকসভা ভোটে সিপিএমের যাদবপুরের প্রার্থী সৃজন ভট্টাচার্যের (Srijan Bhattacharya) দলবদলের সম্ভাবনা নিয়ে যখন রাজ্য রাজনীতি সরগরম, ঠিক তখনই জি ২৪ ঘণ্টার সঙ্গে একান্ত সাক্ষাত্‍কারে, বিস্ফোরক সৃজন ভট্রাচার্য। ভোটের আর দু'মাসও বাকি নেই। সৃজন কি দল ছাড়ছেন? 

    বিশেষ করে নির্বাচনের আগে বা পরে এক দলের নেতাকে অন্য দলে নাম লেখাতে দেখা এখনকার দস্তুর। এই আবহেই গত কয়েকদিন ধরে নেটদুনিয়ায় এবং রাজনৈতিক অন্দরে একটি গুঞ্জন ডালপালা মেলছিল— সৃজন ভট্টাচার্য কি তবে তৃণমূল কংগ্রেসের পথে? সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে এই সমস্ত জল্পনাকে সপাটে উড়িয়ে দিয়ে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করলেন এই বামপন্থী ছাত্রনেতা।

    দলবদলের গুঞ্জন ও সৃজনের প্রতিক্রিয়া

    সৃজন ভট্টাচার্যের দলবদল নিয়ে যখন তাঁর প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হয়, তখন তাঁর কণ্ঠে ঝরে পড়ে আত্মবিশ্বাস এবং কিছুটা কৌতুকও। তিনি সাফ জানান, যারা এই ধরণের রটনা ছড়াচ্ছে, তারা সম্ভবত ভুল মানুষের কাছে প্রশ্ন করছে। তাঁর কথায়, 'আমি জানি না আমি তৃণমূলে যাচ্ছি, আর আমার মনে হয় তৃণমূলও জানে না যে আমি তাদের দলে যাচ্ছি।'

    সৃজন স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, রাজনৈতিক মহলে ভিন্ন মতাদর্শের মানুষের সাথে পরিচয় বা কথাবার্তা থাকা মানেই আদর্শ ত্যাগ করা নয়। সারা বছরই বিভিন্ন দলের মানুষের সাথে তাঁর আলাপ-আলোচনা হয়, কিন্তু তার সাথে দলবদলের কোনও সম্পর্ক নেই। তিনি জানিয়েছেন, 'যতদিন বাঁচব, সিপিআই(এম)-ই করব।'

    প্রতীক উর রহমান প্রসঙ্গ ও ব্যক্তিগত সমীকরণ

    প্রতীক উর রহমানের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ এবং তাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিতর্ক নিয়ে সৃজনকে প্রশ্ন করা হলে সৃজন স্বীকার করেন যে, প্রতীক উর এবং তিনি দীর্ঘ সময় একসঙ্গে কাজ করেছেন। সহকর্মী হিসেবে তাঁদের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। SFI- এর হয়ে একসঙ্গে দীর্ঘ পথচলা তাঁদের। তবে প্রতীক উরের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত বা বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বিশেষ মন্তব্য করতে রাজি হননি। তাঁর মতে, এটি সংগঠনের অভ্যন্তরীণ বিষয়। তিনি বা প্রতীক উর কেউই দল ছাড়ছে বলে তাঁর জানা নেই। দলের দেওয়া দায়িত্ব পালন করাই তাঁর মূল লক্ষ্য।

    সোশ্যাল মিডিয়া ও 'নিষ্ক্রিয়তা'র অভিযোগ

    বিরোধীদের একাংশ বা সমালোচকদের দাবি ছিল, গত কয়েক মাস ধরে সৃজন ভট্টাচার্যের সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইলে দলীয় কর্মকাণ্ডের চেয়ে অন্যান্য পোস্ট বেশি দেখা যাচ্ছে। এই অভিযোগের উত্তরে সৃজন জানান, তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় কী পোস্ট করবেন তা তাঁর ব্যক্তিগত বিষয় হতে পারে, কিন্তু মাঠের রাজনীতিতে তিনি সবসময় সক্রিয়।

    এসএফআই (SFI) থেকে উঠে আসা এই তরুণ নেতা বর্তমানে দলের যে স্তরে কাজ করছেন, সেখানে তাঁর দায়বদ্ধতা নিয়ে কোনও সংশয় নেই বলেই তিনি জানান। তিনি মনে করেন, রাজনীতি শুধুমাত্র ফেসবুক বা টুইটারে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সংগঠনের দেওয়া কাজ নিষ্ঠার সাথে পালন করাই আসল পরীক্ষা।

    কেন এই জল্পনা?

    বাংলার বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তরুণ প্রজন্মের বাম নেতাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে। বিশেষ করে যাদবপুরের মতো কেন্দ্রে সৃজনের লড়াই নজর কেড়েছিল সকলের। তাই তাঁর মতো একজন 'ক্রাউড পুলার' নেতার গতিবিধি নিয়ে মানুষের আগ্রহ থাকা স্বাভাবিক। তবে সৃজন মনে করেন, এই জল্পনাগুলোর পিছনে হয়তো কোনও বিশেষ মহলের স্বার্থ কাজ করছে, তিনি বলেছেন, 'যারা রটাচ্ছে আমি তৃণমূলে যাচ্ছি, তারা হয় নির্বোধ, না হয় শয়তান...'

    সৃজন ভট্টাচার্যের একটি বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছে— আদর্শগত লড়াইয়ে তিনি কোনও আপস করতে রাজি নন। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে যখন নৈতিকতা এবং আদর্শের চেয়ে সুবিধাবাদ অনেক সময় প্রাধান্য পায়, তখন সৃজনের মতো তরুণ নেতাদের এই 'চিরকাল লাল ঝান্ডার সঙ্গে থাকার' অঙ্গীকার বাম কর্মীদের মনে নতুন করে অক্সিজেন জোগাবে। বৃহস্পতিবার সিপিএম রাজ্য কমিটির বৈঠকেও সৃজন থাকবে বলে জানিয়েছেন।

    যাদবপুরের মাটি থেকে উঠে আসা এই ছাত্রনেতা বুঝিয়ে দিয়েছেন, তাঁর লড়াই ব্যক্তিগত লাভের জন্য নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট আদর্শের প্রসারের জন্য। তৃণমূল বা অন্য কোনও দলে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনাকে তিনি যে ভাষায় নস্যাৎ করেছেন, তা আগামী দিনে তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতাকে আরও মজবুত করবে।

    রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই— এই প্রবাদকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সৃজন নিজের অবস্থানে অনড়। তিনি কেবল একজন দক্ষ বক্তাই নন, বরং একজন কৌশলী সংগঠক হিসেবেও নিজেকে প্রমাণ করতে চান। এখন দেখার বিষয়, আগামী পঞ্চায়েত বা বিধানসভা নির্বাচনে সৃজন এবং তাঁর দল এই জনমতকে কতটা ভোটে রূপান্তর করতে পারে। তবে আপাতত, সৃজনের দলবদলের জল্পনায় যবনিকা পড়ল বলা যায়।

     

  • Link to this news (২৪ ঘন্টা)