মৌমিতা চক্রবর্তী: বাংলার রাজনীতিতে দলবদল যখন জলভাতে পরিণত হয়েছে, তখন এক ভিন্ন সুর শোনা গেল সিপিআইএমের ছাত্রনেতা এবং ২০২৪ লোকসভা ভোটে তমলুক থেকে সিপিআইএম প্রার্থী সায়ন বন্দ্য়োপাধ্যায়। বারবার দিল্লি থেকে ফোন, গেরুয়া শিবিরে যোগ দেওয়ার হাতছানি— সবটাই অত্যন্ত সপাটে প্রত্যাখ্যান করলেন তিনি। তাঁর স্পষ্ট কথা, রাজনৈতিক আদর্শ কোনও পরিধেয় বস্ত্র নয় যে চাইলেই বদলে ফেলা যাবে। 'আদর্শ কি ফোন কলেই বদলে যায়?'— বিজেপি-র প্রস্তাব ফিরিয়ে বিস্ফোরক সায়ন বন্দ্যোপাধ্যায়।
দিল্লি থেকে ডজনখানেক ফোন: নেপথ্যে বিজেপি?
সাক্ষাৎকারে বাম যুবনেতা এবং ২০২৪-এর চাঞ্চল্যকর দাবি করেছেন যে, গত কয়েক দিনে দিল্লি থেকে তাঁর কাছে অন্তত ১২-১৩ বার ফোন এসেছে। ফোনদাতারা নিজেদের বিজেপি-র প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন এবং তাঁকে তাঁদের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে আলাপ করার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। সায়ন বলেন, 'আমি জানি না ওরা আমার নম্বর কোথায় পেল, কিন্তু গতকালও আমার কাছে ফোন এসেছে।' বিজেপি-র মতো একটি সর্বভারতীয় দল কেন হঠাৎ প্রতীকের মতো একজন বামপন্থী ছাত্রনেতার প্রতি আগ্রহী হল, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে জল্পনা শুরু হয়েছে। তবে প্রতীক এই বিষয়টিকে দেখছেন ভিন্ন নজরে। তাঁর মতে, কোনো রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী মানুষের কাছে এ ধরণের প্রস্তাব আসা আদতে তাঁর লড়াইয়েরই স্বীকৃতি।
'আমি বামপন্থী আদর্শের সঙ্গেই দাঁড়িয়ে'
দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর অনেকেই ভেবেছিলেন প্রতীক হয়তো এবার অন্য কোনো শিবিরে নাম লেখাবেন। কিন্তু সেই জল্পনায় জল ঢেলে তিনি জানান, তাঁর রক্তে বামপন্থা। সায়ন বলেন, 'আমি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাস করি, আমি বামপন্থী আদর্শে বিশ্বাস করি। অন্য কোথাও যাওয়া আমার পক্ষে অসম্ভব।' প্রতীক মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি যখন কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হয়েছিলেন, তখন তিনি যথেষ্ট প্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন। সজ্ঞানে, বিচার-বুদ্ধি খাটিয়ে তিনি যে পথ বেছে নিয়েছিলেন, সাময়িক কোনো টালমাটাল পরিস্থিতি বা প্রলোভনে পড়ে সেই পথ থেকে বিচ্যুত হওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়।
মানুষ ও পশুর পার্থক্যের প্রসঙ্গ
দলবদলু রাজনীতিকদের কড়া সমালোচনা করে প্রতীক এক বিশেষ দার্শনিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, মানুষের সঙ্গে পশুর মৌলিক পার্থক্য হলো তার বিবেক এবং মূল্যবোধ। প্রতীক প্রশ্ন তুলেছেন, "যদি কেউ মনে করে একটা ফোন কলেই কারো আদর্শ বদলে দেওয়া সম্ভব, তবে বুঝতে হবে মানুষের অধিকার এবং মূল্যবোধ সম্পর্কে তাদের নূন্যতম ধারণা নেই।" তিনি আরও যোগ করেন যে, যারা আজ এ দল কাল ও দল করে, তাদের কোনো মৌলিক চরিত্র থাকে না। নিজের আদর্শের প্রতি দায়বদ্ধ থাকাটাই একজন সচেতন নাগরিকের প্রধান ধর্ম বলে তিনি মনে করেন।
রাজনৈতিক গুরুত্ব ও বিশ্লেষণ
প্রতীক উর রহমানের এই অবস্থান বর্তমান বঙ্গ রাজনীতির প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
বাম শিবিরের জন্য বার্তা: যদিও দল তাঁকে বহিষ্কার করেছে, কিন্তু প্রতীক উরের এই 'আদর্শবাদী অবস্থান' নিচুতলার বাম কর্মীদের মনে তাঁর প্রতি সহমর্মিতা বাড়াতে পারে।
বিজেপি-র কৌশল: বিজেপি যে তলে তলে বাম শিবিরের ক্ষুব্ধ তরুণ নেতাদের ওপর নজর রাখছে এবং তাঁদের কাছে টানার চেষ্টা করছে, প্রতীকের এই দাবি তা প্রমাণ করে দিল।
ভবিষ্যৎ পথ: প্রতীক স্পষ্ট করেছেন যে তিনি সিপিআই(এম) ছেড়ে অন্য কোথাও যাচ্ছেন না। তবে দলের সাথে তাঁর যে সংঘাত তৈরি হয়েছে, তা তিনি কীভাবে মেটান বা স্বতন্ত্রভাবে বামপন্থী লড়াই জারি রাখেন কি না, সেটাই এখন দেখার।
সায়ন নিজেকে একজন 'আদর্শবাদী যোদ্ধা' হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে সংবিধান এবং রাজনৈতিক বিশ্বাসের কথা। যেখানে ক্ষমতার লোভে দলবদল এখনকার স্বাভাবিক ঘটনা, সেখানে দাঁড়িয়ে প্রতীকের এই দৃঢ়তা একদিকে যেমন প্রশংসনীয়, অন্যদিকে এটি তাঁর রাজনৈতিক পরিপক্কতারও পরিচয় দেয়।
দিল্লি থেকে আসা ডজনখানেক ফোন কল উপেক্ষা করে তিনি যে সাহসিকতা দেখিয়েছেন, তা আগামী দিনে তাঁকে রাজনীতির ময়দানে কতটা প্রাসঙ্গিক রাখে, তার উত্তর দেবে সময়। তবে আপাতত তাঁর এই 'বিজেপি-বিমুখতা' গেরুয়া শিবিরের জন্য এক বড় ধাক্কা।
সৃজন-প্রতীক উর-সায়নরা প্রমাণ করে দিলেন যে, রাজনীতিতে পদ বড় কথা নয়, পথটাই আসল। পাহাড়প্রমাণ অনিশ্চয়তা সামনে থাকলেও নিজের 'লাল ঝাণ্ডা'র আদর্শ থেকে একচুলও নড়তে রাজি নন। তাঁদের এই লড়াই কি শেষ পর্যন্ত বাম শিবিরের অন্দরেই তাঁকে আবার জায়গা করে দেবে? নাকি তিনি নতুন কোনও ফ্রন্ট তৈরি করবেন? উত্তর লুকিয়ে আছে ভবিষ্যতের গর্ভে।