• মরণফাঁদ ডায়মন্ড হারবার রোড, সবচেয়ে ‘অসুরক্ষিত’ ৪ কিমি
    বর্তমান | ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • স্বার্ণিক দাস, কলকাতা: গত ৪ আগস্ট স্কুলে যাচ্ছিল ৮ বছরের ফুটফুটে ছেলেটা। লরির চাকায় পিষ্ট হয়ে মৃত্যু হয় বড়িশা হাইস্কুলের ছাত্র সৌরনীলের। মৃত্যুর ২১ দিন পর ছেলের জন্মদিনে শোকাহত মা দীপিকা সরকার বলেছিলেন, ‘ডায়মন্ড হারবার রোড অত্যন্ত অসুরক্ষিত। আমার ছেলেটাকে কেড়ে নিল।’ মর্মান্তিক দুর্ঘটনার ৩ বছর পরও প্রযোজ্য সন্তানহারা মায়ের আর্তি— ‘অসুরক্ষিত’।

    গত ৩৬ মাসে ডায়মন্ড হারবার রোডে দুর্ঘটনার বলি ১২ জন নাগরিক। তার মধ্যে ১১ জনেরই মৃত্যু হয়েছে বেহালা চৌরাস্তা ক্রসিং থেকে জোকা পর্যন্ত রাস্তার মধ্যে। ডায়মন্ড হারবার রোডের এইটুকু অংশের দৈর্ঘ্য মাত্র ৪ কিলোমিটার। শহরে এমন আর কোনও রাস্তা নেই যেখানে ৪ কিমির মধ্যে এত মানুষ প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। এই খতিয়ান কলকাতা পুলিশের উর্ধ্বতন কর্তাদের চোখ কপালে তুলেছে। খোদ পুলিশ কমিশনার সুপ্রতিম সরকার উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, ‘ডায়মন্ড হারবার রোডে ট্রাফিক কর্তারা পরিদর্শন করেছেন। দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’ কিন্তু, বাস্তবে কোনও প্রভাব নেই।

    ২০২৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি জোকা ইএসআই হাসপাতালের কর্মী রূপা মণ্ডলের (৩৮) নাইট ডিউটি ছিল। পরের দিন সকালে স্কুটার চালিয়ে ছেলেকে স্কুলে দিতে যাচ্ছিলেন তিনি। ঠাকুরপুকুর ৩এ বাসস্ট্যান্ডের সামনে বেপরোয়া বাস পিষে দেয় হাসপাতাল কর্মীকে। দু’মাসের মধ্যে ঠাকুরপুকুর থানায় লরির ধাক্কায় মৃত্যু হয় পুলিশ কনস্টেবলের। স্থানীয়দের অভিযোগ, পরপর দু’টি দুর্ঘটনাতেও ফেরেনি ট্রাফিক বিভাগের হুঁশ।

    পরপর কয়েকটি দুর্ঘটনার জেরে শহরের সবচেয়ে দুর্ঘটনাপ্রবণ রাস্তায় পথ নিরাপত্তা নিয়ে নড়েচড়ে বসেছিল লালবাজার। বেহালা চৌরাস্তাকে ‘মডেল ক্রসিং’ তৈরির উদ্যোগ নেয় পুলিশ। তৎকালীন ট্রাফিক বিভাগের এক কর্তা বলেন, ক্রসিংয়ে পথচারীদের নিরাপত্তার জন্য ব্যারিয়ার বসানো হবে। একইঙ্গে নিরাপদ পারাপারের জন্য ‘রিফিউজ আইল্যান্ড’ তৈরিরও প্রস্তাব গৃহীত হয়। কিন্তু, সেই উদ্যোগ কার্যত বিশবাঁও জলে। প্রায় আড়াই বছর কেটে গেলেও চৌরাস্তা এখনও পথচারী, সাইকেল-বাইক আরোহীদের জন্য অত্যন্ত অসুরক্ষিত। এলাকাবাসী অম্লান সেন বলেন, ‘পুলিশের সেই ঢক্কানিনাদের পরও চৌরাস্তায় দুর্ঘটনা ঘটেছে। আরও তিনটি দুর্ঘটনায় ৩ জনের মৃত্যু হয় এই ক্রসিংয়েই। অথছ ঢিলছোড়া দূরত্বেই ট্রাফিক গার্ডের অফিস। তাহলে কোথায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা?’
    চৌরাস্তা ছাড়াও ৪ কিলোমিটারের মধ্যে আরও দু’টি হটস্পট রয়েছে কলকাতা পুলিশের অন্তর্ভুক্ত ডায়মন্ডহারবার রোডে— ঠাকুরপুকুর ৩এ বাসস্ট্যান্ড ও জোকা ইএসআই ক্রসিং। ২০২৩ সালের ৭ নভেম্বর ৩এ বাসস্ট্যান্ডে দু’টি বাসের রেষারেষিতে বেঘোরে প্রাণ হারান সিআইডির প্রাক্তন কর্তা নির্মল কুমার দাস (৬৯)। স্ত্রীর সঙ্গে দক্ষিণ ২৪ পরগনার বাগানবাড়িতে যাচ্ছিলেন তিনি। তাঁর গাড়ির উপর উঠে যায় আস্ত বাস। স্ত্রী রক্ষা পেলেও মৃত্যু হয় নির্মলবাবুর। সেই দুর্ঘটনায় ২১ জন বাসযাত্রী জখম হন। অন্যদিকে, চলতি বছরে ঠাকুরপুকুর ট্রাফিক গার্ডের মাথা ব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে জোকা ইএসআই হাসপাতালের ক্রসিং। ছ’দিনের ব্যবধানে দু’টি পৃথক দুর্ঘটনায় তিনজনের মৃত্যু হয়েছে এখানে। জখম হয়েছেন আরও একজন। এখানেও পুলিশি নজরদারির অভাবকেই দায়ী করছেন সাধারণ মানুষ। রত্না মণ্ডল নামে স্থানীয় এক ব্যবসায়ীর কথায়, ‘খুব ঘটা করে এখানে ট্রাফিক পুলিশের কিয়স্ক তৈরি হয়েছিল। কিন্তু, সেখানে হাতেগোনা উর্দিধারী নজরে আসে। টহলদারি তলানিতেই।’
  • Link to this news (বর্তমান)