প্রবীর চক্রবর্তী ও দেবাঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়: নির্বাচনের প্রাক্কালে বাংলার রাজনীতিতে দলবদল বা 'পলিটিক্যাল মাইগ্রেশন' কোনো নতুন ঘটনা নয়। তবে উত্তরবঙ্গের রাজনীতিতে বিজেপির শক্ত ঘাঁটিতে ফাটল ধরার জল্পনা বর্তমানে রাজ্য রাজনীতিকে উত্তপ্ত করে তুলেছে।
ভোটের মুখে পদ্মশিবিরে ভাঙন? উত্তরবঙ্গের বিজেপি বিধায়কের ঘাসফুলে যোগদানের জল্পনায় তুঙ্গে রাজনৈতিক পারদ।
রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের দামামা বাজতে আর খুব বেশি দেরি নেই। ঠিক এই সন্ধিক্ষণে বঙ্গ রাজনীতিতে ফের একবার 'দলবদল'-এর চেনা চিত্রনাট্য ফিরে আসার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের রাজনৈতিক অলিন্দে এখন একটাই প্রশ্ন— তবে কি এবার বিজেপির গড় হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলে বড়সড় ভাঙন ধরতে চলেছে?
সূত্রের খবর, উত্তরবঙ্গের একজন প্রভাবশালী বিজেপি বিধায়ক আজই তৃণমূল কংগ্রেসে (TMC) যোগ দিতে পারেন। এই জল্পনাকে কেন্দ্র করে সরগরম হয়ে উঠেছে উত্তর থেকে দক্ষিণবঙ্গ।
উত্তরবঙ্গে পদ্মশিবিরে অস্বস্তি
বিগত লোকসভা এবং বিধানসভা নির্বাচনে উত্তরবঙ্গ দু'হাত উজাড় করে আশীর্বাদ করেছিল ভারতীয় জনতা পার্টিকে (BJP)। আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার বা জলপাইগুড়ির মতো জেলাগুলোতে বিজেপির সাংগঠনিক শক্তি অত্যন্ত মজবুত।
কিন্তু নির্বাচনের ঠিক আগে সেই দুর্গে ফাটল ধরার সম্ভাবনা গেরুয়া শিবিরের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। শোনা যাচ্ছে, উত্তরবঙ্গের এক হেভিওয়েট বিধায়ক দীর্ঘদিনের মান-অভিমান এবং দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে দল ছাড়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
জল্পনার কেন্দ্রে যারা
যদিও কোনও পক্ষই এখনও নাম প্রকাশ করেনি, তবে উত্তরবঙ্গের রাজনৈতিক মহলে কান পাতলে বেশ কিছু নাম উঠে আসছে। গত কয়েক মাস ধরেই উত্তরবঙ্গের বেশ কিছু বিজেপি জনপ্রতিনিধির সঙ্গে রাজ্য সরকারের মন্ত্রীদের 'সখ্যতা' লক্ষ্য করা গিয়েছিল।
বিশেষ করে চা-বলয় এবং তরাই-ডুয়ার্স এলাকার উন্নয়ন নিয়ে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে স্থানীয় বিধায়কদের একাংশের দূরত্ব তৈরি হয়েছিল বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা।
আজই কি তৃণমূলে যোগদান?
কলকাতার তৃণমূল ভবনে আজ দুপুরের পর এক বিশেষ সাংবাদিক বৈঠক ডাকা হয়েছে। সূত্রের খবর, সেখানেই উত্তরবঙ্গের ওই বিজেপি বিধায়ক জোড়াফুল পতাকা হাতে তুলে নিতে পারেন। যদি এই দলবদল বাস্তবে রূপ পায়, তবে তা বিজেপির জন্য বড় ধাক্কা হবে। কারণ, উত্তরবঙ্গে বিজেপির যে একচেটিয়া আধিপত্য ছিল, তাতে ফাটল ধরালে তৃণমূলের পক্ষে আসন্ন নির্বাচনে হৃত জমি উদ্ধার করা অনেক সহজ হবে।
বিজেপি ও তৃণমূলের প্রতিক্রিয়া
বিজেপির রাজ্য নেতৃত্বের দাবি, 'ভোটের আগে ভয় দেখিয়ে বা প্রলোভন দিয়ে বিধায়ক ভাঙানোর চেষ্টা করছে শাসক দল। তবে এতে আমাদের সংগঠনের কোনো ক্ষতি হবে না।'
অন্যদিকে, তৃণমূল শিবিরের দাবি, "বিজেপির জনবিরোধী নীতি এবং উত্তরবঙ্গের মানুষের প্রতি বঞ্চনার প্রতিবাদেই অনেক বিজেপি নেতা এখন উন্নয়নের শরিক হতে চাইছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাজের প্রতি আস্থা রাখতেই এই যোগদানের ঢল।"
রাজনৈতিক প্রভাব
উত্তরবঙ্গের রাজনীতিতে এই সম্ভাব্য দলবদলের প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী।
১. সাংগঠনিক বিপর্যয়: নির্বাচনের ঠিক আগে বিধায়ক দল ছাড়লে নিচুতলার কর্মীদের মনোবল ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
২. ভাবমূর্তি সংকট: 'দলবদল' ইস্যুটিকে তৃণমূল বারবার বিজেপির অন্তর্কলহ হিসেবে তুলে ধরতে পারবে।
৩. ভোটের সমীকরণ: রাজবংশী বা চা-শ্রমিকদের ভোটব্যাঙ্কে এর কী প্রভাব পড়ে, এখন সেটাই দেখার।
বিজেপি র পদত্যাগী বিধায়ক বিষ্ণুপ্রসাদ শর্মা যোগ দিলেন টিএমসিতে। কার্শিয়াং এর বিধায়ক ছিলেন তিনি। তিনি যোগদানের পরই তৃণমূল ভবনে এসে বলেছেন, 'প্রধামনমন্ত্রী পরমহংসদেবক 'স্বামী' বলেছেন, এটা বাঙালির অপমান'।
বিষ্ণু প্রসাদ শর্মার বক্তব্য:
জনগণের উদ্দেশ্যে বার্তা: 'আমি জনগণকে বলতে চাই, আপনাদের সম্মান আজ পর্যন্ত আমি বজায় রাখলাম। বিধানসভার শেষ দিনেই আমি বলেছিলাম যে আমি এখন এক 'মুক্ত পাখি'। আপনাদের জন্য একটি উন্নত সমাজ এবং সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়েই আমি আজ তৃণমূলে (TMC) যোগ দিলাম।'
দলের অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ: 'দলীয় কেন্দ্র থেকে আমাকে কোনো তহবিল বা টাকা পাঠানো হতো না। আজ সারা দেশজুড়ে বিশৃঙ্খলার রাজনীতি চলছে। আমি শুধুমাত্র জনগণের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারব না বলেই এতকাল দল ছাড়তে পারিনি। কিন্তু আমাকে প্রতিনিয়ত 'ধর্মের রাজনীতি' করতে বলা হতো, যা আমি মেনে নিতে পারিনি। এই বিষাক্ত পরিবেশ আমাকে ভিতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছিল।'
গোর্খা ইস্যু ও বিজেপির ভূমিকা: 'বিজেপি গোর্খাদের টর্চের আলো দেখিয়ে সূর্য বলে দাবি করত (মিথ্যা আশা দিত)। আমি কি জুমলা (মিথ্যা প্রতিশ্রুতি) রাজনীতি করব? বিজেপি গোর্খাদের একটা সুতো দিয়েও সাহায্য করবে না, এটা স্রেফ শোষণ। পঙ্কজ কুমার আইপিএস-কে পাঠানো হয়েছে ঠিকই, কিন্তু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক কেন এখনও অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার দেয়নি? এমনকি দার্জিলিংয়ের সাংসদ রাজু বিস্তা তাঁর হোটেলের খরচ বহন করেন।'
বিজেপির প্রতি অনাস্থা: 'ইন্টারলোকেটর (মধ্যস্থতাকারী) মানে তো তাঁর একটি অফিস থাকা প্রয়োজন। তাঁর অফিস কোথায়? তিনি হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে পছন্দের বিধায়কদের ডেকে পাঠাতেন। বিজেপিকে বিশ্বাস করলে গোর্খাদের উন্নতি হওয়া সম্ভব নয়। তাই আমি দিদির (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়) লড়াইয়ের শরিক হতে এসেছি।'
'বিজেপি গোর্খাদের ঠকিয়েছে, উন্নয়নের জন্য দিদির লড়াইয়ে সামিল হলাম': বিষ্ণু প্রসাদ শর্মা
উত্তরবঙ্গের রাজনীতির সমীকরণ বদলে দিয়ে বিজেপি ত্যাগী বিধায়ক বিষ্ণু প্রসাদ শর্মা আজ তীব্র আক্রমণ শানালেন গেরুয়া শিবিরের বিরুদ্ধে। তিনি স্পষ্ট জানান যে, বিধানসভার শেষ দিনেই তিনি নিজেকে 'মুক্ত পাখি' হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন এবং আজ জনগণের সম্মান রক্ষা ও গোর্খাদের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দিয়েছেন।
তাঁর অভিযোগ, বিজেপি তাঁকে দিয়ে 'ধর্মের রাজনীতি' করাতে চেয়েছিল, যা তাঁর আদর্শের পরিপন্থী। তিনি বলেন, "বিজেপি গোর্খাদের টর্চের আলো দেখিয়ে সূর্য বলে ভুলিয়ে রেখেছে। তারা গোর্খাদের এক ইঞ্চিও উন্নতি করবে না, বরং শোষণ করবে।" তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, পাহাড়ের জন্য নিযুক্ত ইন্টারলোকেটরের কোনো নির্দিষ্ট অফিস নেই কেন? কেন তাঁকে হোয়াটসঅ্যাপে বৈঠক ডাকতে হয়?
সাংসদ রাজু বিস্তার বিরুদ্ধেও ক্ষোভ উগরে দিয়ে তিনি জানান, বিজেপিকে বিশ্বাস করে গোর্খাদের কোনো লাভ নেই। পাহাড়ের প্রকৃত উন্নয়ন এবং সুস্থ রাজনীতির স্বার্থেই তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত শক্ত করতে এসেছেন।
রাজনীতি সম্ভাবনার খেলা। শেষ পর্যন্ত উত্তরবঙ্গের সেই 'রহস্যময়' বিধায়ক আজ ঘাসফুল শিবিরে নাম লেখান কি না, তা সময়ের অপেক্ষা। তবে এই জল্পনা যে নির্বাচনের আগে বাংলার রাজনৈতিক ময়দানকে আরও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।