প্রবীর চক্রবর্তী: রাজ্য রাজনীতিতে বাম শিবিরের অন্দরে কি বড়সড় ফাটল দেখা দিচ্ছে? লোকসভা এবং আসন্ন নির্বাচনের প্রস্তুতি চলাকালীন সিপিএমের অন্দরে যে অসন্তোষের মেঘ ঘনীভূত হচ্ছিল, তা এবার প্রকাশ্য এল। দলের শীর্ষ নেতৃত্ব, বিশেষ করে রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের বিরুদ্ধে একরাশ ক্ষোভ উগরে দিলেন তরুণ তুর্কি নেতা প্রতীকু উর রহমান। তাঁর মন্তব্যে রীতিমতো অস্বস্তিতে আলিমুদ্দিন স্ট্রিট।
সেলিমের বিরুদ্ধে 'ব্যক্তিগত পকেট' রাজনীতির অভিযোগ
বিদ্রোহী এই নেতার অভিযোগের তীর সরাসরি মহম্মদ সেলিমের দিকে। তাঁর দাবি, সেলিম সাহেব গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে দল চালানোর বদলে নিজের একটি ছোট বলয় তৈরি করেছেন। তিনি বলেন, 'মহম্মদ সেলিম আজ মাত্র কয়েকজনকে নিয়ে দল চালাচ্ছেন।' এই ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ রাজনীতির ফলে দলের নিচুতলার এবং পুরনো কর্মীরা ব্রাত্য হয়ে পড়ছেন বলে মনে করছেন রাজনীতির কারবারিরা।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অভিযোগটি উঠেছে দলের গুরুত্ব এবং সময় বণ্টন নিয়ে। প্রতিকুর জানান, 'মহম্মদ সেলিম হুমায়ুন কবীরের মতো নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করার সময় পান, অথচ নিজের দলের নেতাদের ফোন করার বা কথা বলার সময় তাঁর হয় না।' প্রতীক উর মনে করেন, এই বৈষম্যমূলক আচরণ অত্যন্ত 'ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ'।
বিপদে পড়লে দায় এড়ানোর রাজনীতি
বাম রাজনীতির আদর্শ যেখানে যৌথ নেতৃত্বের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে, সেখানে সেলিমের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রতিকুর। তিনি অভিযোগ করেন, যখন কোনো কাজের কৃতিত্ব নেওয়ার সময় আসে, তখন সেলিম সামনে থাকেন। কিন্তু দল যখন বিপদে পড়ে বা কোনো জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তখন তিনি দায় এড়িয়ে বলেন— "সবই দল জানে।" নেতার এই দ্বিচারিতা নিচুতলার কর্মীদের মনোবল ভেঙে দিচ্ছে বলে প্রতিকুর মনে করেন।
তৃণমূল ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশংসায় পঞ্চমুখ
তবে সবচেয়ে বড় চমক ছিল প্রতিকুর রহমানের গলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূয়সী প্রশংসা। যেখানে সিপিএম বরাবরই তৃণমূলের কট্টর বিরোধী, সেখানে প্রতিকুর স্পষ্ট ভাষায় বলেন, "মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সুপ্রিম কোর্টে লড়াই করে নজির গড়েছেন।" শুধু তাই নয়, কেন্দ্রীয় বঞ্চনা এবং রাজ্যের দাবি আদায়ের লড়াইয়ে (SIR লড়াই) সিপিএম যে তৃণমূলের চেয়ে কয়েক যোজন পিছিয়ে আছে, তাও অকপটে স্বীকার করে নিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, 'লড়াইতে তৃণমূলের থেকে সিপিএম অনেক পিছিয়ে রয়েছে।'
রাজনৈতিক মহলের জল্পনা
প্রতিকুর রহমানের এই বিস্ফোরক মন্তব্যের পর রাজনৈতিক মহলে জল্পনা শুরু হয়েছে— তবে কি তিনিও বিষ্ণু প্রসাদ শর্মার মতো অন্য কোনো রাজনৈতিক সমীকরণের দিকে হাঁটছেন? বাম শিবিরের অন্দরে মহম্মদ সেলিমের নেতৃত্ব নিয়ে এর আগেও প্রশ্ন উঠেছিল, কিন্তু প্রতিকুরের মতো একজন পরিচিত মুখ যেভাবে প্রকাশ্য বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন, তাতে সিপিএমের অভ্যন্তরীণ সংকট যে চরম সীমায় পৌঁছেছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
তৃণমূল কংগ্রেসের লড়াইয়ের প্রশংসা এবং নিজ দলের নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থা— এই দুই মিলিয়ে প্রতিকুর রহমান কি শীঘ্রই ঘাসফুল শিবিরে নাম লেখাতে চলেছেন? এখন সেই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে বাংলার রাজনৈতিক অলিন্দে।