• ‘অনুদান’ নিয়ে অসন্তুষ্ট সুপ্রিম কোর্ট, খয়রাতি রাজনীতির শুরু কোথায়? কী বলছে রাজনৈতিক দলগুলি?
    এই সময় | ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • প্রচলিত নাম ‘ভাতা’ বা ‘অনুদান’। অর্থাৎ, জনসাধারণকে নগদ অর্থ বা পরিষেবা পাইয়ে দেওয়া। শাসকদল যুক্তি দেয়, এটা প্রান্তিক মানুষকে আর্থিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতি। বিরোধীদের যুক্তি, পুরোটাই ভোট কেনার কৌশল। কিন্তু, বিরোধী আসন থেকে শাসকদলের চেয়ারে বসলেই সেই পুরোনো অস্ত্র ব্যবহার করছে প্রায় সব রাজনৈতিক দল। গত কয়েক বছরে আরও প্রকট হয়েছে এই ‘পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতি’। বৃহস্পতিবার যা নিয়ে প্রবল সমালোচনা দেখা গেল দেশের শীর্ষ আদালতের পর্যবেক্ষণে।

    দীর্ঘদিন ধরেই ‘কিছু পেতে গেলে কিছু দিতে হয়’, এই অস্ত্রে শান দিয়েছে দেশের প্রায় প্রতিটি বড় বড় রাজনৈতিক দল। ভোটারদের আনুগত্য পেতে শিক্ষা-স্বাস্থ্য-সমাজ ব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়নের ‘লং রুট’ ছেড়ে ‘ফ্রিবিজ়’-এর শর্ট কাট ধরতে শুরু করেছে রাজনৈতিক দলগুলি। সেখানেই আপত্তি তুলেছে সুপ্রিম কোর্ট। বিচারপতিদের পর্যবেক্ষণ, ‘আপনি একটি রাজস্ব উদ্বৃত্ত রাজ্য হন, তবুও কি আপনার কর্তব্য নয় যে আপনি সেই অর্থ জনসাধারণের উন্নয়নের জন্য— রাস্তাঘাট, হাসপাতাল, স্কুল উন্নয়নের জন্য ব্যয় করবেন? তার পরিবর্তে, আপনি নির্বাচনের সময়ে খাবার, পোশাক বিলি করেন এবং মানুষ তা পেয়ে খুশি হয়। কী ঘটে চলেছে এই দেশে?’

    তবে ‘খয়রাতি রাজনীতি’ নিয়ে দেশের শীর্ষ আদালতের বিচারপতিদের কপালে চিন্তার ভাঁজ দেখা গিয়েছিল এর আগেও। ২০২৫ সালেও একটি মামলার পরিপ্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি বিআর গবাই এবং বিচারপতি অগাস্টিন জর্জ মসিহর ডিভিশন বেঞ্চের অনেকটা একই পর্যবেক্ষণ ছিল। আদালত জানিয়েছিল, বিনামূল্যে খাবার পেয়ে গেলে, বিনা পরিশ্রমে অ্যাকাউন্ট ভরে গেলে কাজ করার প্রয়োজনই হবে না।

    আমেরিকার প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ফ্র্যাঙ্কলিন ডেলানো রুজভেল্ট প্রায় ১.৫ কোটি আমেরিকানকে সাহায্য করার জন্য ৮.৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ব্যয় করেছিলেন। আমেরিকাকে আর্থিক মন্দা থেকে বের করে এনেছিল তাঁর এই প্রয়াস। এই পদক্ষেপের সমর্থক ছিলেন ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ জন মেনার্ড কেইনস। সেই কবে ‘ফ্রিবিজ়’-এর সাক্ষী ছিল পাশ্চাত্যের অর্থনীতি।

    স্বাধীন ভারতেও এর শুরু বহুদিন আগে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে, তামিলনাড়ুর প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী (১৯৫৪-১৯৬৩) কুমারস্বামী কামরাজ শিশুদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষা এবং খাবার দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। যা পরবর্তীকালে রাজ্যের শিক্ষার হার বাড়াতে সাহায্য করেছিল। ১৯৮২ সালে তামিলনাড়ুর তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী এমজি রামচন্দ্রন আনুষ্ঠানিক ভাবে শুরু করে মিড ডে মিল কর্মসূচি। এর আগে ১৯৬৭ সালে তদানীন্তন মাদ্রাজে দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কাজাগম (ডিএমকে)এক টাকায় এক বিশেষ পরিমাণ চাল দেওয়ার কাজ শুরু করেছিল।

    এর পরে ধাপে ধাপে বাড়তে থাকে ‘অনুদান’ দেওয়ার পালা। বিনামূল্যে বিদ্যুৎ, খাদ্যশস্য, টিভি সেট, স্মার্ট ফোন, ল্যাপটপ, সোনা, গরু, ইলেকট্রিক পাখা থেকে সাইকেল— কী নেই সেই তালিকায়।

    ‘অনুদান’ দেওয়ার তালিকায় বিজেপি, কংগ্রেস, আম আদমি পার্টি, ডিএমকে, তৃণমূল কংগ্রেস-সহ দেশের প্রায় সব বড় রাজনৈতিক দলই রয়েছে। কর্নাটকের সাম্প্রতিক নির্বাচনে কংগ্রেস প্রত্যেক ডিপ্লোমাধারী বা স্নাতক বেকারকে ১৫০০ টাকা এবং ২০০০ টাকা, প্রত্যেক বাড়ির কর্ত্রীকে ২০০০ টাকা দেওয়ার কথা জানায়। ২০২৩-এর জানুয়ারিতে মধ্যপ্রদেশ সরকার এনেছিল ‘লাডলি বহেন যোজনা।’ প্রতি মাসে ২১-৬০ বছর বয়সি মহিলাদের ১২৫০ টাকা করে ভাতা দেয় সেখানকার সরকার। ২০২৪ সালে বিজেপি সমর্থিত মহারাষ্ট্রের ‘মহাযুতি’ সরকার ‘মুখ্যমন্ত্রী মাঝি লাডকি বহেন যোজনা’ চালু করে। কয়েকমাস আগে বিহারের নির্বাচনে ভোট ঘোষণার মধ্যেই ‘মুখ্যমন্ত্রী মহিলা রোজগার যোজনা’র মাধ্যমে মহিলাদের অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয় ১০ হাজার টাকা। ২০২১ সালের পরে পশ্চিমবঙ্গে ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ প্রকল্প শুরু করে তৃণমূল কংগ্রেস সরকার। কয়েকদিন আগেই রাজ্যের মাধ্যমিক উত্তীর্ণ যুবক-যুবতীদের জন্য চালু করা হয়েছে ‘যুব সাথী’ প্রকল্প। যার মাধ্যমে ১৫০০ টাকা নগদ আর্থিক সাহায্য করা হচ্ছে।

    ‘খয়রাতি রাজনীতি’ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণের পরিপ্রেক্ষিতে রাজ্যের মন্ত্রী শশী পাঁজা বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের এই ব্যাখ্যা গুরুত্বপূর্ণ। কোনও একটি রাজ্যকে নয়, প্রতিটি রাজ্যকেই বলেছে। এটাকে ঠিক ফ্রিবিজ় বলা উচিত নয়, নির্বাচিত সরকার মানুষের পাশে দাঁড়ানোটা কর্তব্য বলে মনে করে। সার্বিক ভাবে ভারতবর্ষের রাজনীতি নিয়ে বিচারপতিরা ভাবনা চিন্তা করছেন। কেন্দ্রের বাজেটে নতুন কোনও দিশা নেই। সেই কারণেই বিচারপতিরা পর্যবেক্ষণের কথা জানিয়েছেন।’

    বিষয়টি নিয়ে বিজেপি নেতা রাহুল সিনহা বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের এই পর্যবেক্ষণ সবথেকে বেশি প্রযোজ্য বাংলার জন্য। রাজ্যের সরকার বিদায় লগ্নে টাকার বৃষ্টি করে গিয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের প্রতি এই পর্যবেক্ষণ লাগু হয়। যাওয়ার আগে এই সরকার পশ্চিমবঙ্গকে দেউলিয়া করার ব্যবস্থা করেছে। এই পর্যবেক্ষণ সারা দেশের জন্যে বললেও প্রযোজ্য সর্বাগ্রে পশ্চিমবঙ্গের জন্য।’

  • Link to this news (এই সময়)