মিল্টন সেন: ছেলেধরা গুজব ছড়িয়ে পড়তে সেই সন্দেহে মা ও মেয়েকে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা, গাড়িতে আগুন, উদ্ধার করতে গিয়ে পুলিশের উপর হামলা, ২০১৭ সালের সেই নৃশংস ঘটনায় বড়সড় রায় দিল আদালত।
হুগলির বলাগড় থানার অন্তর্গত আসানপুর গ্রামের ঘটনায় মোট ২৫ জন অভিযুক্তকেই দোষী সাব্যস্ত করল চুঁচুড়া আদালত। ঘটনার সূত্রপাত ২০১৭ সালের ২১ জানুয়ারি বিকেলে।
কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপকের স্ত্রী রঞ্জুবালা ঘোষ ও তাঁর মেয়ে অপর্ণা ঘোষ পরিচারিকার খোঁজে আসানপুর গ্রামে যান। তাঁদের মারুতি গাড়ির চালক ছিলেন বিশ্বনাথ মণ্ডল।
গ্রামে অচেনা লোকজন দেখেই মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে ছেলেধরা গুজব। উত্তেজিত গ্রামবাসীরা গাড়ি ঘিরে ধরে মারধর শুরু করে। অভিযোগ, মা-মেয়েকে মারধর করা হয়, চালককে নির্মমভাবে আক্রমণ করা হয় এবং মারুতি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
ঘটনার খবর পেয়ে বলাগড় থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালে তাদের উপরও হামলা চালানো হয়। মোট ১১ জন পুলিশ ও সিভিক ভলান্টিয়ার আহত হন। গুরুতর আহত সিভিক ভলান্টিয়ার অখিল বন্ধু ঘোষ তীরবিদ্ধ হন।
আহতদের প্রথমে বলাগড় ব্লক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, পরে গুরুতর আহতদের চিকিৎসা চলে কল্যাণী হাসপাতাল ও এসএসকেএম হাসপাতালে।
এই ঘটনায় বলাগড় থানার পুলিশ স্বতঃপ্রণোদিত মামলা রুজু করে। তদন্তকারী অফিসার ছিলেন অলোক কুমার চট্টোপাধ্যায়। ২০১৭ সালের ৯ জুন পুলিশ চার্জশিট জমা দেয় ২৫ জন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে, যার মধ্যে পাঁচজন মহিলা।
২০২১ সালের ২০ এপ্রিল মামলায় চার্জ গঠন হয়। গ্রামবাসী, চিকিৎসক, পুলিশ ও আক্রান্তরা মিলিয়ে মোট ২৭ জন সাক্ষী আদালতে বয়ান দেন।
বুধবার চুঁচুড়া আদালতের ফাস্ট ট্র্যাক কোর্টের বিচারক পীযূষ কান্তি রায় অভিযুক্ত ২৫ জনকেই ভারতীয় দণ্ডবিধির ১৪৯, ৩৩৩/১৪৯, ৩২৬/১৪৯, ৩০৭/১৪৯ ও ৪৩৫/১৪৯ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করেন।
এই মামলার সরকারি আইনজীবী ছিলেন জয়ন্ত সাহা। রায়ের পর সরকারি কৌঁসুলি শঙ্কর গাঙ্গুলী বলেন, ‘বলাগড়ের আসানপুর কাণ্ড একটি যুগান্তকারী মামলা। ছেলেধরা গুজবে সেই সময় একাধিক নৃশংস ঘটনা ঘটেছিল। এখানে একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারের দুই মহিলাকে মারধর, চালককে আক্রমণ, গাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া এবং পুলিশকে তীরবিদ্ধ করা হয়। এই মামলায় দৃষ্টান্তমূলক সাজা হতে পারে।’
তিনি আরও জানান, যে ধারাগুলিতে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে, তাতে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে। একই মামলায় একসঙ্গে ২৫ জনকে দোষী সাব্যস্ত করার ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে বিরল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।