• বিরিয়ানির আড়ালে দেশ জুড়ে ৭০,০০০ কোটি টাকার জালিয়াতি! IT দপ্তরের AI তদন্তে পর্দা ফাঁস
    এই সময় | ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • রেস্তোরাঁয় গিয়ে বিরিয়ানি খেলেন। বিল মিটিয়ে বাড়ি চলে এলেন। জানতেও পারলেন না, এর আড়ালে হয়ে গেল বড় জালিয়াতি! কয়েকটি রেস্তোরাঁয় রুটিন তল্লাশি। তা থেকেই খোঁজ মিলেছিল এই জালিয়াতির হিমশৈলের চূড়ার। পরে আরও গভীর তদন্তে ফাঁস হলো প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকার কর ফাঁকির এক বিশাল জালিয়াতি কারবার!

    প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে গোটা দেশজুড়ে কর ফাঁকি দিয়ে চলেছে নামী-দামি বহু রেস্তোরাঁ, আত্মসাৎ করে চলেছে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব। এই ঘটনায় স্তম্ভিত খোদ আয়কর বিভাগের দুঁদে গোয়েন্দারাও।

    ৭০,০০০ কোটি টাকার জালিয়াতি, রেস্তোরাঁর কর ফাঁকি, আয়কর বিভাগের তদন্ত— কী মাথা গুলিয়ে গেল তো? আসুন বিষয়টা একটু সহজে বুঝে নেওয়া যাক।

    আপনি যখন কোনও রেস্তোরাঁয় খেতে যান, তখন বিলের সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ GST বা কর দেন। নিয়ম অনুযায়ী, রেস্তোরাঁ মালিকের দায়িত্ব সেই টাকা সরকারের ঘরে জমা দেওয়া।

    কিন্তু আয়কর বিভাগের এক তদন্তে দেখা গিয়েছে, দেশের হাজার হাজার রেস্তোরাঁ গত কয়েক বছর ধরে কৌশলে এই কর ফাঁকি দিয়ে আসছে। আর সব মিলিয়ে এই জালিয়াতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭০,০০০ কোটি টাকায়।

    আয়কর বিভাগের গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, রেস্তোরাঁগুলি তাদের বিক্রিবাটার আসল তথ্য গোপন করে। তারা একটি বিশেষ ‘বিলিং সফটওয়্যার’ ব্যবহার করে, যা দিয়ে খুব সহজেই হিসেবের খাতা থেকে বিক্রির তথ্য মুছে ফেলা যায়।

    গোয়েন্দাদের দাবি, প্রায় ১ লক্ষেরও বেশি রেস্তোরাঁ এই একই সফটওয়্যার ব্যবহার করে সরকারের চোখকে ফাঁকি দিয়েছে।

    এই ঘটনার সূত্রপাত গত নভেম্বর মাসে। হায়দরাবাদের কয়েকটি নামী রেস্তোরাঁয় রুটিন তল্লাশি চালাতে গিয়েছিলে আইটি বিভাগের গোয়েন্দারা।

    দেখা যায় ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে এখনও পর্যন্ত প্রায় ২.৪৩ লক্ষ কোটি টাকার বিলিং হয়েছে ওই বিশেষ বিলিং সফটওয়্যারটিতে। এর মধ্যে ১৩,৩১৭ কোটি টাকার বিলিং তথ্য সরাসরি ‘পোস্ট-বিলিং ডিলিশন’-এর মাধ্যমে মুছে ফেলা হয়েছে।

    তবে এটা শুধুমাত্র একটি সফটওয়্যারের হিসেব। ১.৭৭ লক্ষ রেস্তোরাঁ আইডি এবং ভারতের অন্যান্য রাজ্যের তথ্য বিশ্লেষণ করে আয়কর বিভাগ দেখেছে, কর ফাঁকি কেবল বিল মুছে ফেলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।

    অনেকে বিল মোছেনি ঠিকই, কিন্তু আয়ের তুলনায় ট্যাক্স অনেক কম দিয়েছে। এই সব ধরনের জালিয়াতি মিলিয়ে দেশজুড়ে মোট কর ফাঁকির পরিমাণ প্রায় ৭০,০০০ কোটি টাকা বলে তাদের অনুমান।

    রেস্তোরাঁগুলি মূলত ৩টি উপায়ে এই কাজ করেছে:

    আপনি যখন কার্ড বা UPI-তে পেমেন্ট করেন, তার রেকর্ড মোছা সম্ভব নয়। কিন্তু যখনই কেউ নগদ টাকায় বিল মেটাতেন, রেস্তোরাঁগুলি সেই বিলটি তাদের সিস্টেম থেকে পুরোপুরি মুছে ফেলত। যাতে মনে হয় ওই খাবারটি বিক্রিই হয়নি।

    অনেক সময়ে তারা টানা কয়েক দিন বা সপ্তাহের সমস্ত বিক্রির রেকর্ড সিস্টেম থেকে ডিলিট করে দিত। আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সময়ে তারা আসল বিক্রির একটা ছোট অংশ দেখাত।

    কিছু ক্ষেত্রে তারা সিস্টেম থেকে বিল ডিলিট না করলেও, যখন সরকারের কাছে হিসেব জমা দিত, তখন আসল বিক্রির চেয়ে অনেক কম অঙ্ক লিখে জমা দিত।

    মানুষের পক্ষে এই লক্ষ লক্ষ রেস্তোরাঁর কয়েক বছরের কয়েক কোটি বিল যাচাই করা প্রায় অসম্ভব ছিল। তাই আয়কর বিভাগ এবার ব্যবহার করেছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা AI এবং জেনারেটিভ AI টুল।

    আমেদাবাদে ওই সফটওয়্যার প্রোভাইডারটির সার্ভার থেকে ১.৭৭ লক্ষ রেস্তোরাঁ আইডি-র প্রায় ৬০ টেরাবাইট তথ্য (যা কয়েক কোটি বইয়ের সমান) জোগাড় করে AI-এর মাধ্যমে বিশ্লেষণ করেন আয়কর বিভাগের হায়দরাবাদের ডিজিটাল ল্যাব। মুহূর্তের মধ্যেই AI ধরে ফেলে যে কোথায় কোথায় বিল ডিলিট করা হয়েছে এবং কত টাকার কারচুপি হয়েছে।

    তদন্তে দেখা গিয়েছে, এই জালিয়াতিতে এগিয়ে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলিই।

    সবচেয়ে বেশি, প্রায় ২,০০০ কোটি টাকার বিল ডিলিট করা হয়েছে।

    প্রায় ১,৫০০ কোটি টাকার বিল মুছে ফেলা হয়েছে

    প্রায় ১,২০০ কোটি টাকার কারচুপি ধরা পড়েছে।

    সেন্ট্রাল বোর্ড অফ ডাইরেক্ট ট্যাক্সেস বা CBDT ইতিমধ্যেই এই তদন্তের পরিধি বাড়িয়েছে। সারা দেশজুড়ে তদন্ত চলছে। গোয়েন্দাদের ধারণা, অন্যান্য বিলিং সফটওয়্যার ব্যবহার করেও এমন জালিয়াতি হয়ে থাকতে পারে। দোষী রেস্তোরাঁ ও সংস্থাগুলির বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। সরকারের এই কড়া পদক্ষেপে স্পষ্ট, প্রযুক্তির মাধ্যমে কর ফাঁকি দিলে এখন আরও উন্নত প্রযুক্তি দিয়েই সেই চুরি ধরা হবে।

  • Link to this news (এই সময়)