• বাবা-মা কারা? অন্তত শিবলালকে যদি খুঁজে পাওয়া যায়... উত্তর খুঁজছে রিকিতা
    এই সময় | ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • সুনন্দ ঘোষ

    গঙ্গার ঘাটের ভিড়টা তখন কিছুটা পাতলা হয়ে এসেছে। দুপুর তিনটে হবে। শিবলাল–এর সামনে এক যুবক এসে দাঁড়ালেন। যুবকের কোলে মাস কয়েকের ছোট একটা মেয়ে। খানিকটা মিনতি করে যুবক শিবলালকে বললেন, ‘দেখুন না! ওর মা–কে কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না। এদিকে আমাকে একটা ডুব তো দিতেই হবে। বেলা গড়িয়ে আসছে। আপনি একটু ধরুন না। একটা ডুব মেরে উঠে আসছি।’

    শিবলালের কোলে মেয়েকে দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে গঙ্গায় নেমে গেলেন সেই যুবক। অনেকগুলো মাথা ওঠা–নামা করছে জলে। আর ঠাহর করতে পারলেন না শিবলাল। ওই অবস্থায়, কোলে মেয়েটিকে নিয়ে ঠায় রাত ১১টা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকলেন ঘাটে। ফিরলেন না যুবক। ধীর পায়ে উত্তর বন্দর থানায় পৌঁছলেন শিবলাল।

    ১৯৮৭–র ১৮ মার্চ। প্রায় ৩৯ বছর আগের কথা। সে দিন শিবলালের কোলে থাকা ‘রিকিতা’–র আজকের ঠিকানা ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেন। সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োলজিস্ট তিনি। এতদিন পরে সাত হাজার কিলোমিটার দূর থেকে সেই শিবলালের বিস্তারিত খোঁজ শুরু করেছেন তিনি। বৃহস্পতিবার কোপেনহেগেন থেকে ভিডিয়ো কলে বললেন, ‘আসলে আমার বায়োলজিক্যাল বাবা–মাকে খুঁজছি। শিবলাল আমার কেউ নয়। কিন্তু, যে ব্যক্তি সে দিন আমাকে শিবলালের কোলে দিয়ে উধাও হয়ে গিয়েছিলেন, তাঁর ডিটেলস হয়তো শিবলাল দিতে পারবেন।’ শিবলাল জানলে তো তখনই পুলিশকে যুবকের ডিটেলস দিতেন! নাছোড় রিকিতা–র কথায়, ‘আপনার শহরের পুলিশ কি জানবে না? তখন কি কোনও তদন্তই হয়নি? সেই সময়ে কোনও মিসিং ডায়েরি হয়নি?’

    রিকিতা–র প্রতিনিধি হিসেবে পুনে থেকে কলকাতায় এসেছেন অঞ্জলি পাওয়ার। চাইল্ড ট্র্যাফিকিং–য়ের বিরুদ্ধে কাজ করার পাশাপাশি ভারত থেকে দত্তক নেওয়া যুবক–যুবতীদের শিকড়ের সন্ধান দেন এই সমাজকর্মী–আইনজীবী। বুধবার উত্তর বন্দর থানায় ই–মেল করে অঞ্জলি জানতে চেয়েছেন, সে দিন যে ব্যক্তি ছোট রিকিতাকে থানায় তুলে দেওয়ার পরে জেনারেল ডায়েরি (জিডি নম্বর ৯০৩, ১৮/৩/৮৭) হয়েছিল, তাঁর বিস্তারিত তথ্য চাই। যে বা যাঁরা এসে ছোট রিকিতাকে ওই ব্যক্তির কোলে তুলে দিয়েছিল, তাঁর বা তাঁদের সম্পর্কে পুলিশের কাছে কী তথ্য রয়েছে?

    অঞ্জলির কথায়, ‘শিবলাল হয়তো সে দিন মনে করেছিলেন, ওই যুবক বুঝি রিকিতার বাবা। হতেও তো পারে ওই যুবকই বাবা। আবার হতে পারে, রিকিতাকে ইচ্ছাকৃত ভাবে পরিত্যাগ করতে ওই যুবকের সাহায্য নেওয়া হয়েছিল। শিবলালের মতো তাঁর সঙ্গেও রিকিতার কোনও রক্তের সম্পর্ক নেই। কোনও ভাবে আমরা যদি ওই যুবক পর্যন্ত পৌঁছতে পারি, তা হলে অনেকটা কাজ হবে।’ এ ভাবেই জট ছাড়িয়ে, শহরের এ গলি–সে গলি ঘুরে বছর দুয়েক আগে স্প্যানিশ তরুণী প্রিয়া–র জন্মদাত্রী বাবা–মাকে খুঁজে বার করেছিলেন অঞ্জলি।

    ১৯৮৭–তে দক্ষিণ বন্দর থানা থেকে জুভেনাইল কোর্ট হয়ে সাহিত্যিক মৈত্রেয়ী দেবীর তৈরি অ্যাডপশন সেন্টার ‘খেলাঘর’–এ ঠাঁই হয়েছিল রিকিতার। সেখানেই তাঁর নামকরণ হয়। সেখানেই তাঁর জন্মতারিখ ১৯৮৬–র ২ অগস্ট হিসেবে নথিভুক্ত হয়। পরে ড্যানিশ দম্পতি তাঁকে দত্তক নিয়ে চলে যান। নাম বদলে হয় জুলি। যদিও দত্তক সংক্রান্ত কাগজপত্রে এখনও জ্বলজ্বল করে রিকিতা নামটা। সেখানেই রয়েছে ১৯৮৭–র জিডি–র কপি।

    এত দিন পরে কেন মনে হচ্ছে শিকড়ের কথা?

    রিকিতা ওরফে জুলির উত্তর — ‘মনে আগেও হয়েছে। সুযোগ হয়নি। দত্তক বাবা–মায়ের মৃত্যু, এক সায়েন্টিস্টের সঙ্গে আমার বিয়ে, এখন তিন সন্তান, সঙ্গে চাকরি — সবমিলিয়ে সংসারের পাকেচক্রে উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। আমার পক্ষে একা ভারতে গিয়ে এ ভাবে খোঁজ করাও মুশকিল ছিল। বছর দুয়েক আগে একটা ডকুমেন্টরিতে অঞ্জলিকে দেখি। জানতে পারি অঞ্জলি এবং ওর বন্ধু অরুণ ডোল আমাদের মতো দত্তকদের শিকড়ের খোঁজে সাহায্য করেন। আমি খুব এক্সাইটেড হয়ে অঞ্জলির সঙ্গে যোগাযোগ করি।’

    তিনি যতটা আশাবাদী, পুলিশ অবশ্য ততটা নয়। কলকাতা পুলিশের এক অফিসারের কথায়, ‘৪০ বছর আগের জিডি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।’ জানা গিয়েছে, তখন কম্পিউটারাইজ়ড ব্যবস্থা ছিল না। জিডি হাতে লেখা হতো। কোনও জিডি নিয়ে মামলা চললে তার নথি রাখা হয়। অন্যথায় নষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা।

    রিকিতা অবশ্য বলছেন, শিবলালের সন্ধান পেলেই ফ্লাইটের টিকিট কাটবেন। ৩৯ বছর পরে পা রাখবেন ভারতের মাটিতে।

  • Link to this news (এই সময়)